ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ, দূষণ আর মানসিক উদ্বেগ— সব মিলিয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর পড়ছে বাড়তি চাপ। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ নয়, বরং প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটানোই হতে পারে সুস্থ থাকার সহজ উপায়। জাপানের বহুলচর্চিত স্বাস্থ্যচর্চা শিনরিন-ইয়োকু বা ফরেস্ট বাথিং (Forest Bathing) নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি সেই দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। ফরেস্ট বাথিং ক্যানসারের চিকিৎসা নয়, আবার ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায়ও নয়। কিন্তু এটি শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে, যা দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কী এই শিনরিন-ইয়োকু?
জাপানি ভাষায় 'শিনরিন' অর্থ বন এবং 'ইয়োকু' অর্থ নিজেকে সেই পরিবেশে নিমজ্জিত করা। ১৯৮০-র দশকে জাপানে এই স্বাস্থ্যচর্চার সূচনা হয়। এর মূল ভাবনা খুবই সহজ— গাছপালায় ঘেরা পরিবেশে ধীরে ধীরে হাঁটুন, গভীর শ্বাস নিন, চারপাশের গন্ধ, শব্দ, আলো-ছায়া এবং বাতাসকে অনুভব করুন। কোনও লক্ষ্য নয়, কোনও তাড়াহুড়ো নয়— শুধু প্রকৃতির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো।
প্রকৃতির সঙ্গে একটু সময় কাটানো। ছবি: সংগৃহীত
কেন উপকারী হতে পারে?
টোকিওর নিপ্পন মেডিক্যাল স্কুলের চিকিৎসক ও গবেষক ড. কিং লি দীর্ঘদিন ধরে ফরেস্ট বাথিংয়ের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গাছ থেকে নির্গত ফাইটোনসাইডস নামে এক ধরনের প্রাকৃতিক উদ্বায়ী যৌগ শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে ন্যাচারাল কিলার সেল নামে পরিচিত শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা ও কার্যক্ষমতা বাড়তে পারে। এই কোষগুলি ভাইরাসে আক্রান্ত কোষ এবং শরীরের অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করে ধ্বংস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু গবেষণায় এমনও দেখা গিয়েছে, বনাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর পর এই ইতিবাচক প্রভাব কয়েক দিন পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করছেন, এই তথ্যকে কখনওই ক্যানসার প্রতিরোধ বা ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ভর করে বংশগত কারণ, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ, বয়স এবং অন্যান্য বহু বিষয়ের উপর।
কেন এত উপকার? ছবি: সংগৃহীত
শুধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই নয়
ফরেস্ট বাথিংয়ের সম্ভাব্য উপকারিতা এখানেই শেষ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিয়মিত প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটালে শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমতে পারে। পাশাপাশি রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, উদ্বেগ কমায়, মন ভালো রাখে, ঘুমের মান উন্নত করে এবং মানসিক একাগ্রতা বাড়ায়। সব মিলিয়ে শরীর ও মনের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ফরেস্ট বাথিং কীভাবে শুরু করবেন?
ফরেস্ট বাথিংয়ের জন্য পাহাড় বা ঘন জঙ্গলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ির কাছাকাছি কোনও বড় পার্ক, উদ্যান বা গাছপালায় ঘেরা শান্ত জায়গাতেও এই অভ্যাস করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অন্তত ২০ মিনিট থেকে একঘণ্টা সময় নিয়ে ধীরে হাঁটুন। মোবাইল ফোন দূরে রাখুন। হাঁটার গতি কমিয়ে গাছের গন্ধ, পাতার শব্দ, পাখির ডাক, বাতাসের ছোঁয়া— সবকিছু মন দিয়ে অনুভব করুন। ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন। মনে রাখবেন, এটি শরীরচর্চার চেয়ে অনেক বেশি একটি মানসিক অভিজ্ঞতা।
প্রকৃতির সান্নিধ্য। ছবি: সংগৃহীত
সুস্থ থাকার সহজ অভ্যাস
ফরেস্ট বাথিং নিঃসন্দেহে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হতে পারে। কিন্তু এটি কখনওই চিকিৎসা, ওষুধ বা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিকল্প নয়। ক্যানসারসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানো হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু ব্যস্ত জীবনের মাঝে এই ছোট্ট অভ্যাসটি শরীর ও মন— উভয়কেই একটু স্বস্তি দিতে পারে। আর সেই কারণেই বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক ও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছে জাপানের এই সহজ অথচ অভিনব স্বাস্থ্যচর্চা।
