পরিচালক ও অভিনেতা অনুরাগ কাশ্যপ সম্প্রতি জানিয়েছেন, হার্ট অ্যাটাকের পর তিনি প্রায় ২৭ কেজি ওজন কমিয়েছেন। এই পরিবর্তনের জন্য তিনি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ পানীয়-ভিত্তিক খাদ্যতালিকা অনুসরণ করেছিলেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা অনেককে অনুপ্রাণিত করলেও চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন, এমন ডায়েট কখনওই সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
একজন মানুষের বয়স, ওজন, হৃদ্যন্ত্রের অবস্থা, অন্যান্য রোগ, ওষুধের ব্যবহার এবং শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই ওজন কমানোর পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। অনুরাগ কাশ্যপের ক্ষেত্রেও তাঁর হার্ট অ্যাটাক, অ্যাজমা এবং দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহারের ইতিহাস মাথায় রেখেই চিকিৎসকেরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই তাঁর ডায়েট অনুসরণ করা মানেই একই ফল মিলবে, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
হার্ট অ্যাটাকের পর শরীরের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কী?
হার্ট অ্যাটাকের পর হৃদ্যন্ত্র এক ধরনের আঘাতের মধ্য দিয়ে যায়। এই সময় শরীরকে দ্রুত ওজন কমানোর চাপে ফেলা নয়, বরং প্রয়োজন পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ।
হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষার মূলমন্ত্র হল ধারাবাহিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে সুষম ও পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত হওয়া। নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে নিরাপদ পথ। দ্রুত ফলের আশায় শরীরকে চরম পরীক্ষার মধ্যে ফেলা উচিত নয়।
অনুরাগ কাশ্যপ। ছবি: সংগৃহীত
ক্র্যাশ ডায়েট কেন বিপজ্জনক?
দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অনেকেই হঠাৎ করে ক্যালরি কমিয়ে দেন বা শুধু তরল খাবারের উপর নির্ভর করেন। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের পর এই ধরনের সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্র্যাশ ডায়েটের কারণে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, পেশিশক্তি কমে যেতে পারে, এমনকী হৃদ্পেশিও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামা হৃদ্যন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দ্রুত ওজন কমানো কি কখনও গ্রহণযোগ্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদভাবে ওজন কমানোর আদর্শ গতি হল সপ্তাহে প্রায় ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং হৃদ্যন্ত্রও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে না।
ক্র্যাশ ডায়েট সবার জন্য নয়। ছবি: সংগৃহীত
হার্ট সুস্থ রাখতে কী খাবেন?
হার্ট অ্যাটাকের পর খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত এমন খাবারে, যা হৃদ্যন্ত্রকে সুরক্ষা দেয় এবং শরীরের পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। যেমন—
- ফাইবার বা আঁশসমৃদ্ধ শাকসবজি, ফল ও দানা শস্য়
- লিন প্রোটিন
- ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর চর্বি
- কম নুন-যুক্ত খাবার
- ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার
একই সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ উপোস থাকা, জিরো-কার্ব বা চরম ক্যালরি-নিয়ন্ত্রিত ডায়েট থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
ওজন কমানোর সময় যদি হঠাৎ দুর্বলতা, বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা, জলশূন্যতা বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। এগুলো শরীরের সতর্কবার্তা হতে পারে।
জরুরি ব্যালেন্স ডায়েট। ছবি: সংগৃহীত
তারকার ডায়েট নয়, নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝুন
তারকাদের ওজন কমানোর গল্প যতটা চোখে পড়ে, তার পেছনের চিকিৎসা, পুষ্টিবিদ, ফিটনেস বিশেষজ্ঞ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ততটা আলোচনায় আসে না। ফলে অনেকেই ভুল করে ভাবেন, একই ডায়েট অনুসরণ করলেই একই ফল পাওয়া সম্ভব।
বাস্তবে প্রত্যেক মানুষের শরীর আলাদা। তাই অন্যের অভিজ্ঞতা নয়, নিজের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতেই ওজন কমানোর পরিকল্পনা করা উচিত।
ওজন কমানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ওজন কমানো নয়, হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখা। দ্রুত ফলের লোভে ক্র্যাশ ডায়েট বেছে নেওয়ার বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ধীরে, নিরাপদে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ওজন কমানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত।
