বর্ষা ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ফের বাড়ছে জ্বর, সর্দি, কাশি ও গলা ব্যথার মতো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে বিভ্রান্তিও। জ্বর এলেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কি কোভিড-১৯, ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু), নাকি সাধারণ ভাইরাল জ্বর? কারণ, তিনটি রোগেরই প্রাথমিক উপসর্গ অনেকটা একই রকম।
তবে চিকিৎসকদের মতে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, যা খেয়াল করলে রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। যদিও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে প্রয়োজনে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ।
চিকিৎসকদের মতে, কোভিড-১৯ এখন আর মহামারির সময়ের মতো একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে আসে না। ভাইরাসের পরিবর্তনের সঙ্গে এর উপসর্গের ধরনও বদলেছে। তবু এটি এখনও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও শ্বাসযন্ত্রের জটিলতার কারণ হতে পারে।
কোভিড-১৯: ধীরে শুরু, কিন্তু দীর্ঘদিন ভোগাতে পারে
বর্তমানে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মধ্যে গলা ব্যথা, শুকনো বা দীর্ঘস্থায়ী কাশি, নাক বন্ধ, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেকের খিদে কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা ডায়েরিয়াও হতে পারে। ফ্লুর মতো হঠাৎ নয়, কোভিডের উপসর্গ সাধারণত এক থেকে দু'দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়ে। আর জ্বর কমে যাওয়ার পরও বহু রোগী কয়েক দিন, এমনকী কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভব করেন। এই দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিই কোভিডকে অনেক ক্ষেত্রে অন্য ভাইরাল সংক্রমণ থেকে আলাদা করে।
ঘরে ঘরে আবার জ্বর-সর্দি-কাশি। ছবি: সংগৃহীত
ফ্লু: কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাবু করে দিতে পারে
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু সাধারণত খুব দ্রুত আঘাত হানে। সকালে সুস্থ থাকা একজন মানুষ বিকেলের মধ্যেই তীব্র জ্বর, কাঁপুনি, তীব্র শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, শুকনো কাশি ও গলা ব্যথায় ভুগতে পারেন। নাক দিয়ে জল পড়া এবং প্রচণ্ড দুর্বলতাও দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, উপসর্গের এই আকস্মিক শুরুই ফ্লুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যদিও অসুস্থতার সময় বেশ কষ্টকর হতে পারে, তবু বেশিরভাগ সুস্থ মানুষ পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সেরে ওঠেন।
সাধারণ ভাইরাল জ্বর: তুলনামূলকভাবে মৃদু
অ্যাডেনোভাইরাস, এন্টারোভাইরাস বা প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জার মতো বিভিন্ন ভাইরাস থেকেও জ্বর হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত হালকা বা মাঝারি জ্বর, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে জল পড়া, হালকা কাশি এবং শরীর ব্যথা দেখা যায়। কারও কারও পেটের অস্বস্তিও হতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পরিমিত জল পান, পুষ্টিকর খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেলেই অধিকাংশ রোগী তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কোভিডের মতো দীর্ঘদিনের ক্লান্তি সাধারণত থাকে না।
প্রতিটি ভাইরাসেরই রয়েছে কিছু ভিন্ন উপসর্গ। ছবি: সংগৃহীত
তিনটি সংক্রমণের মূল পার্থক্য কী?
চিকিৎসকদের মতে, কোভিড-১৯ সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং ক্লান্তি দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে। ফ্লু হঠাৎ করে তীব্র জ্বর ও মারাত্মক শরীর ব্যথা নিয়ে শুরু হয় এবং তুলনামূলক দ্রুত সেরে যায়। অন্যদিকে, সাধারণ ভাইরাল জ্বর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃদু হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই উপসর্গ কমে আসে।
একসঙ্গে একাধিক সংক্রমণও হতে পারে
বর্তমানে একই সময়ে একাধিক ভাইরাস সক্রিয় থাকায় একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে কোভিড ও ফ্লুতে আক্রান্ত হতে পারেন। আবার একটি ভাইরাল সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পরপরই অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও হতে পারে। তাই শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে রোগ নির্ণয় করা সবসময় সম্ভব নয়। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে পরীক্ষা করানো জরুরি।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি তিন দিনের বেশি জ্বর থাকে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, বুকে ব্যথা অনুভূত হয়, অতিরিক্ত ঝিমুনি বা বিভ্রান্তি দেখা দেয়, শরীরে জলশূন্যতা তৈরি হয়, বারবার বমি হয়, ঠোঁট বা আঙুল নীলচে হয়ে যায়, অথবা উপসর্গ কমে যাওয়ার পর আবার বেড়ে যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে ডাক্তারি নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাবেন?
নিয়মিত হাত ধোয়া, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ-নাক ঢেকে রাখা, অসুস্থ থাকলে মাস্ক ব্যবহার করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও জল পান করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোভিড ও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
জ্বর, কাশি ও শরীর ব্যথা এখন আর একটিমাত্র রোগের লক্ষণ নয়। কোভিড-১৯, ফ্লু এবং সাধারণ ভাইরাল জ্বরের উপসর্গের মধ্যে মিল থাকলেও অসুস্থতার শুরু, তীব্রতা এবং সুস্থ হতে সময় লাগার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তাই নিজে নিজে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে উপসর্গ গুরুতর হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
