আটলান্টিকের বুকে বিলাসবহুল সফর হঠাৎই রূপ নিল দুঃস্বপ্নে। এমভি হন্ডিয়াস ক্রুজে এক রহস্যময় সংক্রমণে তিন জনের মৃত্যু, একাধিক যাত্রী গুরুতর অসুস্থ। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসছে এক বিরল মারাত্মক ভাইরাসের নাম। হান্টাভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এখন পুরো বিষয়টি নরজদারি করছে। এখন সবার প্রশ্ন, এই ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর?
নতুন ভাইরাস নয়
হান্টা নতুন কোনও ভাইরাস নয়, কিন্তু এর ভয়াবহতা অনেকের অজানা। এটি মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীরে থাকে। সংক্রমিত প্রাণীর মল, লালা বা মূত্র শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে, সেই অদৃশ্য কণার মাধ্যমেই মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে ভাইরাসটি। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল সংক্রমণের শুরুটা ধরা যায় না। সাধারণ জ্বরের মতোই লক্ষণ- জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা, বমিভাব, দুর্বলতা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
আটলান্টিকে জাহাজে হান্টাভাইরাস! ছবি: সংগৃহীত
ফুসফুস থেকে কিডনি- বিপদ সবার
হান্টাভাইরাস একাধিক ধরনের অসুখের সূত্রপাত করতে পারে। অঞ্চলভেদে যার প্রকৃতি আলাদা। আমেরিকায় বেশি দেখা যায় হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস), যা ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। শ্বাস নিতে কষ্ট, ফুসফুসে তরল জমে যাওয়া এবং দ্রুত জীবন সংকট পর্যন্ত দেখা দেয়। অন্যদিকে, ইউরোপ ও এশিয়ায় দেখা যায় হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম, যা কিডনির উপর আঘাত হানে এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এইচপিএস আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ শতাংশ বলে জানাচ্ছে সেন্টার্স ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন। অর্থাৎ, সংক্রমণ হলে তা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
চিকিৎসা নেই, ভরসা সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট
হান্টাভাইরাসকে ভয় পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ এর নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা বলতে যা বোঝায়, তা মূলত বিশ্রাম, পরিমিত পানীয় পান, উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ। গুরুতর ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর বা উন্নত লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। সংক্রমণের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় নেয় ১ থেকে ৮ সপ্তাহ। এই দীর্ঘ 'নীরব সময়'-ই ভাইরাসটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে, কারণ ততদিনে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়ে যায়।
ভাইরাস বাহক। ছবি: সংগৃহীত
ভারত কি নিরাপদ?
ভারতকে হান্টাভাইরাসের হটস্পট বলা না গেলেও, একেবারে ঝুঁকিমুক্তও নয়। দেশে আগে থেকেই এই ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা ইঁদুরের সংস্পর্শে থাকেন। গুদাম শ্রমিক, কৃষিজীবী তাঁদের ঝুঁকি বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য এই মুহূর্তে আতঙ্কের কারণ কম। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগ অনেক সময় শনাক্তই হয় না। ফলে চিকিৎসকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
মানুষের থেকেও কি ছড়ায়?
হান্টাভাইরাস সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। খুব বিরল ক্ষেত্রে, যেমন আর্জেন্টিনা ও চিলিতে, এমন সংক্রমণ দেখা গেছে। তবুও এই ঘটনায় উদ্বেগের কারণ আছে। কারণ ক্রুজে থাকা যাত্রীরা বিভিন্ন দেশে ফিরে গিয়েছেন। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়েছে কি না, তা জানতে সময় লাগবে।
আতঙ্ক নয়, সতর্কতা জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
কেন আবার শিরোনামে?
২০২৫ সালে এই ভাইরাস নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী হান্টাভাইরাস সংক্রমণে মারা যান। সেই ঘটনার পর থেকেই ভাইরাসটি নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। এবার সমুদ্রের মাঝখানে একটি জাহাজে সম্ভাব্য সংক্রমণ সেই আতঙ্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।
হান্টাভাইরাস বিরল, কিন্তু যখন আঘাত হানে, তা মারাত্মক হতে পারে। এই ভাইরাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব বিপদ চোখে দেখা যায় না। সতর্কতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসাই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আতঙ্ক নয়, সচেতন থাকাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।
