হলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা স্যাম নিল (Sam Neill), জুরাসিক পার্কে যাঁর অভিনয় সবার নজর কেড়েছিল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই জিতে এখন তিনি ক্যানসারমুক্ত। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এক বিরল রক্তের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর অবশেষে তিনি স্বস্তির খবর দিয়েছেন। তাঁর শরীরে ধরা পড়েছিল অ্যাঞ্জিওইমিউনোব্লাস্টিক টি-সেল লিম্ফোমা, যা নন-হজকিন লিম্ফোমার একটি জটিল ও আক্রমণাত্মক রূপ।
স্যাম নিল। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ লড়াই, যখন কেমো-ও কাজ করছিল না
প্রথমে নিয়ম মেনে কেমোথেরাপি চলছিল। কিছুটা সাড়া মিললেও ধীরে ধীরে সেই চিকিৎসা কার্যকারিতা হারায়। একসময় পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে ওঠে যে নিজেই তাঁর অবস্থা গুরুতর বলে উল্লেখ করেন। চিকিৎসার প্রচলিত পথ তখন প্রায় শেষ হয়ে আসছিল, সামনে ছিল অনিশ্চয়তা।
শেষ ভরসা হিসেবে নতুন চিকিৎসার পথে
এই কঠিন সময়েই সামনে আসে আধুনিক চিকিৎসার এক নতুন দিশা সিএআর-টি সেল থেরাপি (CAR-T Cell Therapy)। চিকিৎসকের পরামর্শে এই পদ্ধতিতে শুরু হয় চিকিৎসা। এটি এমন এক পদ্ধতি, যেখানে রোগীর নিজের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই ক্যানসারের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী করে তোলা হয়। চিকিৎসার পর সাম্প্রতিক পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ক্যানসারের কোনও চিহ্ন ধরা পড়েনি।
সিএআর-টি সেল থেরাপি দেখাচ্ছে আশার আলো। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে কাজ করে সিএআর-টি থেরাপি?
এই চিকিৎসা পদ্ধতির মূল শক্তি লুকিয়ে আছে শরীরের টি-সেল বা প্রতিরোধক কোষে। প্রথমে সেই কোষ সংগ্রহ করা হয়, তারপর ল্যাবরেটরিতে জিনগতভাবে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয় যাতে তারা ক্যানসার কোষকে সহজে চিনতে পারে। পরে সেই কোষ শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হলে তারা লক্ষ্যভেদী আক্রমণ চালিয়ে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে শুরু করে। সহজভাবে বলতে গেলে, শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও বুদ্ধিমান ও আক্রমণাত্মক করে তোলা হয়।
কেন এই চিকিৎসা এত গুরুত্বপূর্ণ?
কেমোথেরাপির সীমাবদ্ধতা হল, এটি ভালো-মন্দ সব কোষের উপরেই প্রভাব ফেলে। কিন্তু সিএআর-টি থেরাপি নির্দিষ্টভাবে ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে। ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আরোগ্যের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। বিশেষ করে যখন প্রচলিত চিকিৎসা ব্যর্থ হয়, তখন এই পদ্ধতি নতুন আশার আলো দেখায়।
কোন ধরনের ক্যানসারে কার্যকর?
বর্তমানে এই থেরাপি মূলত ব্লাড ক্যানসার, যেমন লিম্ফোমা, লিউকেমিয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে মাল্টিপল মায়েলোমায় ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও টিউমার বা অন্য ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে, ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণা চলছে। ছবি: সংগৃহীত
সীমাবদ্ধতা
তবে সব সাফল্যের মাঝেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সব দেশে বা সব হাসপাতালে সহজলভ্য নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষ বিশেষ কেন্দ্র বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া সব রোগীর শরীরে এই থেরাপি সমানভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
নন-হজকিন লিম্ফোমা কী?
এই ধরনের ক্যানসার লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমে শুরু হয়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লক্ষণ হিসেবে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, অকারণে জ্বর, রাতে ঘাম, ক্লান্তি বা দ্রুত ওজন কমে যাওয়া দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এগুলো সাধারণ অসুখ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা বিপজ্জনক হতে পারে।
স্যাম নিলের সুস্থ জীবনে ফেরা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
স্যাম নিলের সুস্থ হয়ে ওঠা চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বড় সাফল্য। এটি প্রমাণ করে, আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্যানসারের মতো জটিল রোগের বিরুদ্ধেও নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। যেখানে একসময় আশা প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল, সেখানেই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি এনে দিতে পারে জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ।
ক্যানসার চিকিৎসায় সিএআর-টি সেল থেরাপি এক বিপ্লবের সূচনা করেছে। এখনও এর পথ পুরোপুরি সহজ নয়, কিন্তু প্রতিটি সাফল্যের গল্প ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। স্যাম নিলের এই প্রত্যাবর্তন সেই আশারই প্রতিচ্ছবি।
