ডায়াবেটিস মানেই শুধু রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া, এমন ধারণা এখনও অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বাস্তব বলছে, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতির পাশাপাশি কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব শুধু সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ব্যাখ্যায় এইচসিজি ক্যানসার হসপিটালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডা. সঞ্চয়ন মণ্ডল
দায়ী ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
এই সম্পর্কের অন্যতম কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। যখন শরীর ইনসুলিনের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে পারে না, তখন রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা দীর্ঘক্ষণ বেশি থাকে। ইনসুলিন কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনে সাহায্য করতে পারে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং শরীরে চলতে থাকা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ- সব মিলিয়ে শরীরে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যা অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির পক্ষে অনুকূল হতে পারে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ঝুঁকি বেশি
গবেষণাতেও এই সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে। একটি বৃহৎ জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সামগ্রিকভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং জরায়ুর ক্যানসারের সঙ্গে এর সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। আবার বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার রোগীর উপর করা একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা যায়, আগে থেকে ডায়াবেটিস থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ডায়াবেটিসে বাড়ে একাধিক রোগের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
পরিস্থিতিকে করে জটিল
যাঁদের ইতিমধ্যেই ক্যানসার ধরা পড়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, অস্ত্রোপচার বা ক্ষত সারতে বেশি সময় লাগে এবং কেমোথেরাপির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অসাড়তা (পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি), আরও তীব্র হতে পারে।
মেটফরমিন: আশার আলো
ডায়াবেটিসের বহুল ব্যবহৃত ওষুধ মেটফরমিন নিয়েও বর্তমানে গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় এর সম্ভাব্য ক্যানসার-প্রতিরোধী ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, এখনও তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয়নি। তাই ক্যানসার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই ওষুধ সেবন করা উচিত।
ডায়াবেটিসের সঙ্গে রয়েছে ক্যানসারের যোগসূত্র। ছবি: সংগৃহীত
ভয় নয়
তবে এই তথ্যের উদ্দেশ্য আতঙ্ক তৈরি করা নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ফাস্টিং ও পোস্ট-প্র্যান্ডিয়াল ব্লাড সুগার এবং HbA1c পরীক্ষা করা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, বয়স অনুযায়ী ক্যানসার স্ক্রিনিং করানো এবং শরীরে কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা মানে শুধু রক্তে শর্করা স্বাভাবিক রাখা নয়, বরং সুস্থ জীবনের সম্ভাবনাও বাড়ায়। আর সেই সুরক্ষার অন্যতম দিক হতে পারে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো।
