হঠাৎ আয়নায় তাকিয়ে চোখের সাদা অংশে টকটকে লাল দাগ দেখলে স্বাভাবিকভাবেই মনে ভয়ের সঞ্চার হয়। অনেকেই ভাবেন এটি হয়তো গুরুতর চোখের কোনও অসুখের লক্ষণ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি তেমন বিপজ্জনক কিছু নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম সাবকনজাংটিভাল হেমোরেজ (Subconjunctival Hemorrhage), অর্থাৎ, চোখের পাতলা আবরণীর নীচে সামান্য রক্তক্ষরণ। সাধারণত এই দাগ ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই মিলিয়ে যায় এবং দৃষ্টিশক্তির ওপর তেমন কোনও প্রভাবই ফেলে না।
কী ঘটে চোখের ভেতর?
আমাদের চোখের সাদা অংশকে বলা হয় স্ক্লেরা (Sclera)। এই অংশের উপর একটি স্বচ্ছ পাতলা পর্দা থাকে, যার নাম কনজাংকটিভা (Conjunctiva)। এই স্তরের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র রক্তনালী। কোনও কারণে যদি এই সূক্ষ্ম রক্তনালীর একটি ফেটে যায়, তখন সেই রক্ত কনজাংকটিভার নিচে জমে এবং চোখের সাদা অংশে লাল দাগের মতো দেখা দেয়। এতে সাধারণত চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয় না বা বড় কোনও প্রদাহও তৈরি হয় না।
ছবি: সংগৃহীত
এর সম্ভাব্য কারণ কী?
এ ধরনের রক্তক্ষরণ খুব সাধারণ কারণেও হতে পারে। যেমন—
১. হঠাৎ চাপ তৈরি হওয়া
জোরে কাশি, হাঁচি, বমি, ভারি কিছু তোলা বা বেশি ঝুঁকে কাজ করার সময় চোখের ছোট রক্তনালীতে চাপ পড়ে, তখন এই সমস্য়া দেখা দিতে পারে।
২. চোখে আঘাত
চোখে আঘাত লাগা, চোখে অস্ত্রোপচার বা কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের কারণে কখনও কখনও এই সমস্যা দেখা দেয়।
৩. চোখ বেশি ঘষা
অনেকেই অ্যালার্জি বা ধুলো-বালি পড়লে চোখ বারবার ঘষেন। এতে সূক্ষ্ম রক্তনালী ফেটে যেতে পারে।
৪. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অ্যাসপিরিন, নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ বা হেপারিনের মতো রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ খেলে এমন কিছু ঘটতে পারে।
৫. কিছু শারীরিক সমস্যা
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যার সঙ্গেও অনেক সময় এর সম্পর্ক থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আবার নির্দিষ্ট কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। হঠাৎ করেই লাল দাগ দেখা দেয়।
ছবি: সংগৃহীত
কত দিনে সারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে দাগ নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়। এ সময়ের মধ্যে রক্ত ধীরে ধীরে ভেঙে শোষিত হয়, তাই লাল দাগ পরবর্তীকালে কখনও হলুদ বা হালকা বাদামি রঙের হতে পারে।
সাধারণত এতে তেমন কোনও সমস্যা হয় না। তীব্র কোনও ব্যথা বা চোখ থেকে পুঁজ বা জল পড়ার মতো কোনও সমস্য়া দেখা দেয় না। দৃষ্টিশক্তিও কমে না। হালকা অস্বস্তি থাকলে আর্টিফিশিয়াল টিয়ার ড্রপ ব্যবহার করলে কিছুটা আরাম মেলে।
কখন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন?
যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি নিরীহ, তবু কিছু পরিস্থিতিতে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
- বারবার একই সমস্যা হলে
- চোখে ব্যথা বা দৃষ্টি ঝাপসা
- চোখের চারপাশে ফোলাভাব
- চোখে আঘাত লাগার পর লাল দাগ
চিকিৎসক চক্ষু পরীক্ষা করার পাশাপাশি রক্তচাপ, ওষুধের ইতিহাস ইত্যাদিও খতিয়ে দেখতে পারেন।
ছবি: সংগৃহীত
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- চোখ জোরে ঘষবেন না
- অ্যালার্জি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করুন
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- খেলাধুলা বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় চোখের সুরক্ষায় চশমা ব্যবহার করুন
- রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ খেলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান
হঠাৎ চোখের সাদা অংশে লাল দাগ দেখা দিলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি ছোট রক্তনালী ফেটে যাওয়ার ফল, যা সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে যদি বারবার ঘটে বা অন্য কোনও উপসর্গ থাকে, তখন অবশ্যই চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
