সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রে অভিনেত্রী নীনা গুপ্তা (Neena Gupta)। রীতিমতো ভাইরাল অভিনেত্রীর একটি ভিডিও। সেই ভিডিও দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, ৬৬ বছর বয়সে কি তিনি মা হতে চলেছেন? যদিও অভিনেত্রী নিজেই সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তবু ঘটনাটি সামনে এনেছে এক প্রশ্ন- বেশি বয়সে কি সত্যিই সন্তানধারণ সম্ভব?
মাতৃত্বের বয়স নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে। আজও অনেকে মনে করেন, কুড়ির কোঠাই সন্তান জন্ম দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কিন্তু শিক্ষা, কর্মজীবন, দেরিতে বিয়ে বা ব্যক্তিগত কোন কারণে অনেক নারীই এখন ৩০ পেরিয়ে বা তারও পরে মাতৃত্বের কথা ভাবছেন। আর আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সেই পথকে কিছুটা হলেও করেছে সহজ। তবে প্রশ্ন হল, জৈবিকভাবে বিষয়টি কীভাবে কাজ করে? সত্যিই কি ৫০ বা তারও বেশি বয়সে মা হওয়া সম্ভব?
ছবি: সংগৃহীত
বয়স ও প্রজনন ক্ষমতা
নারীর শরীরে জন্মের সময় থেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু থাকে। সাধারণত একটি মেয়ে সন্তানের জন্মের সময় তার শরীরে প্রায় ১০ থেকে ২০ লক্ষ ডিম্বাণু থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা ক্রমশ কমে। কৈশোরে পৌঁছতে পৌঁছতে তা প্রায় ৩ থেকে ৪ লক্ষে নেমে আসে। এরপর প্রতি মাসে ওভুলেশনে কিছু ডিম্বাণু নষ্ট হয়। ফলে বয়স যত বাড়ে, ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান তত কমে। এই কারণেই ৩০-এর পরে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে এবং ৩৫-এর পর সেই সম্ভাবনা আরও দ্রুত কমতে থাকে। ৪০ পেরলে অনেক সময় ডিম্বাণুর গুণমান এতটাই কমে যায় যে, স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মেনোপজ। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ নারীর মেনোপজ হয়। এই সময়ের পরে শরীর আর স্বাভাবিকভাবে ডিম্বাণু তৈরি করতে পারে না। ফলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যেতে গিয়ে ঠেকে।
তবু কীভাবে সম্ভব দেরিতে মাতৃত্ব?
এখানেই অবদান আধুনিক প্রজনন চিকিৎসার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা পদ্ধতির মাধ্যমে এখন অনেক ক্ষেত্রে বয়সের বাধা অতিক্রম করা কিছুটা সম্ভব হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতিটি হল ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF)। সাধারণভাবে যাকে টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি বলা হয়। এই পদ্ধতিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে ঘটানো হয়। ভ্রূণের বৃদ্ধি কয়েকদিন পর্যবেক্ষণের পর সেটি জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়, যাতে সফল গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ে।
ছবি: প্রতীকী
সফল উদাহরণও রয়েছে
২০০৮ সালে হরিয়ানার এক গ্রামবাসী রাজো দেবী লোহান প্রায় ৬৯ বছর বয়সে আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্যে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। দীর্ঘ ৪৬ বছরের বিবাহিত জীবনে কোনও সন্তান না থাকা, পাঞ্জাবের দলজিন্দর কৌর ২০১৬ সালে ৭২ বছর বয়সে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা ওমকারি পানওয়ার প্রায় ৭০ বছর বয়সে যমজ সন্তানের জন্ম দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। ফার্টিলিটি ট্রিটমেন্টের সাহায্যে তিনি একটি ছেলে ও একটি মেয়ের জন্ম দেন। এ ছাড়া কয়েক বছর আগে উত্তর ২৪ পরগনার এক দম্পতি, একমাত্র সন্তানকে দুর্ঘটনায় হারানোর পর চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরে আবার সন্তানের জন্ম দেন। তখন তাঁর বয়স ৫৪ বছর।
চল্লিশের পরে মাতৃত্ব: তারকাদের মধ্যেও
৪০-এর পর মাতৃত্ব এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়। বলিউড বা বিনোদন জগতেও এমন অজস্র উদাহরণ রয়েছে। অভিনেত্রী ক্য়াটরিনা কাইফ ৪০-এর কাছাকাছি পৌঁছে মা হয়েছেন। জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেত্রী ভারতী সিং-ও ৪০-এর পরে মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন। অভিনেত্রী নন্দিতা দাসও ৪০-এর পর মা হন। আবার অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক ৪২ বছর বয়সে দ্বিতীয়বার মা হন। এই উদাহরণগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে মাতৃত্বের বয়স ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, যদিও প্রত্যেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তান-সুখ। ছবি: সংগৃহীত
ডোনার ডিম্বাণু
বেশি বয়সে মাতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রায়ই ডোনারের ডিম্বাণু ব্যবহার করা হয়। ধরুন, কোনও মহিলার বয়স ৫৫ বা ৬০। তাঁর জরায়ু এখনও গর্ভধারণ করতে সক্ষম, কিন্তু তাঁর নিজের আর কার্যকর ডিম্বাণু নেই। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কমবয়সি কোনও নারীর ডিম্বাণু নেওয়া হয়। এই ডিম্বাণুর সঙ্গে স্বামীর শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। তারপর সেই ভ্রূণ মহিলার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিশুটি জিনগতভাবে ডোনার ও বাবার সঙ্গে যুক্ত হলেও মা-ই শিশুকে গর্ভে ধারণ করেন এবং জন্ম দেন।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ: ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি
বর্তমানে অনেক নারী আগেভাগে নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় এগ ফ্রিজিং। এতে মহিলার শরীর থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। সাধারণত তরল নাইট্রোজেনের মধ্যে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এগুলি রাখা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন।
এই অবস্থায় ডিম্বাণুর জৈবিক কার্যকলাপ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং বহু বছর পর্যন্ত সেগুলি সংরক্ষণ করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেই ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। তারপর আইভিএফ পদ্ধতিতে জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
বেশি বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি
যদিও আধুনিক চিকিৎসা অনেক সুযোগ তৈরি করেছে, তবু বেশি বয়সে গর্ভধারণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শরীরে কিছু রোগের প্রবণতা বাড়ে। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা। এগুলো গর্ভাবস্থাকে জটিল করে তুলতে পারে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে।
এছাড়া ভ্রূণের জিনগত ত্রুটির সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। যেমন ডাউন সিনড্রোমের মতো কিছু অবস্থার ঝুঁকি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। অনেক সময় প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি, কম ওজনের শিশু জন্মানো বা সিজারিয়ান ডেলিভারির সম্ভাবনাও বাড়ে।
ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসকেরা কী বলছেন?
চিকিৎসকদের মতে, ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা থাকলেও, সাধারণভাবে ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে গর্ভধারণ সবচেয়ে নিরাপদ। ৩৫-এর পরে গর্ভধারণকে অনেক সময় অ্যাডভান্সড ম্যাটারনাল এজ বলা হয় এবং তখন নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ খুব জরুরি হয়ে পড়ে। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি মাতৃত্বের বয়সকে অনেকটা বাড়ালেও, নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখুন
মাতৃত্বের সময়সীমা নিয়ে সমাজের ধারণা বদলাচ্ছে। অনেক নারী একটু বেশি বয়সে মা হওয়ার কথা ভাবছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তুলছে ঠিকই, কিন্তু বয়সের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিগুলিও অস্বীকার করা যায় না। তাই দেরিতে মাতৃত্বের পরিকল্পনা করলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঠিক তথ্য জানা, আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এগোনো।
