আজকাল অনেকেই একসঙ্গে একাধিক চিকিৎসাপদ্ধতির উপর ভরসা করেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের জন্য নিয়মিত অ্যালোপ্যাথির ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি হারবাল সাপ্লিমেন্ট বা আয়ুর্বেদিক ওষুধ বা হোমিওপ্যাথিও সেবন করেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন চিকিৎসক জানেনই না, রোগী আর কী কী ওষুধ খাচ্ছেন! আর সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্যা।
চিকিৎসকদের কথায়, অনেকেই মনে করেন হারবাল মানেই নিরাপদ। বাস্তবে কিন্তু বহু হারবাল উপাদান শরীরে সক্রিয়ভাবে কাজ করে এবং অ্যালোপ্যাথির ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে।
কী এই 'মিক্সোপ্যাথি'?
একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতির ওষুধ ব্যবহার করাকে অনেকেই 'মিক্সোপ্যাথি' বলে থাকেন। সমস্যা চিকিৎসাপদ্ধতির বৈচিত্র্যে নয়, বরং চিকিৎসকদের অজান্তে একাধিক ওষুধ খাওয়ায়। ফলে কোনও নতুন উপসর্গ দেখা দিলে সেটি রোগের জন্য, না কোনও নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়, নাকি দুই ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ায় হয়েছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
'মিক্সোপ্যাথি' নয়। ছবি: সংগৃহীত
কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে?
আয়ুর্বেদের কিছু উপাদান অ্যালোপ্যাথি ওষুধের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়ে। আবার কিছু ক্ষেত্রে উলটোটা হয়, ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা মৃগীর মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু হারবাল উপাদান রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
লিভারের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শরীরে প্রবেশ করা অধিকাংশ ওষুধ লিভারের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়। কিছু হারবাল সাপ্লিমেন্ট লিভারের এনজাইমের কার্যকারিতা বদলে দেয়। ফলে কোনও ওষুধ শরীরে অতিরিক্ত সময় থেকে গিয়ে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে, আবার কোনও ওষুধ খুব দ্রুত ভেঙে যাওয়ায় প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
যে ওষুধই খান অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। ছবি: সংগৃহীত
রোগীরা কেন বিষয়টি গোপন রাখেন?
অনেকেই হারবাল সাপ্লিমেন্ট, ভিটামিন বা আয়ুর্বেদিক ওষুধকে 'ওষুধ' বলেই মনে করেন না। তাই চিকিৎসকের কাছে সেগুলোর কথা উল্লেখ করেন না। কেউ আবার ভাবেন, এগুলোর তথ্য জানানো জরুরি নয়। অথচ এই তথ্যই অনেক সময় সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারা সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকবেন?
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মৃগী বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও নতুন হারবাল বা সাপ্লিমেন্ট শুরু করা উচিত নয়।
নিজের ডাক্তারিই বাড়ায় বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
কী করবেন?
চিকিৎসকের কাছে গেলে আপনি যে সব ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে খান, তার সম্পূর্ণ তালিকা জানিয়ে দিন। এর মধ্যে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ, হারবাল সাপ্লিমেন্ট, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথির ওষুধ, ভিটামিন, পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্ট এবং ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ—সবই থাকবে।
নিজের সিদ্ধান্তে কখনও প্রেসক্রিপশনের ওষুধ বন্ধ করবেন না। নতুন কোনও ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগেও অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
'প্রাকৃতিক' মানেই ঝুঁকিমুক্ত নয়
চিকিৎসকদের মতে, কোনও পণ্যের গায়ে 'হারবাল' বা 'ন্যাচারাল' লেখা থাকলেই সেটি সম্পূর্ণ নিরাপদ—এমন ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খেলে সেগুলোর পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া কখনও কখনও গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই নিরাপদ থাকার সবচেয়ে সহজ নিয়ম একটাই—আপনি যা কিছু খান, সবকিছুর কথাই চিকিৎসককে জানান।
