নিজের জীবনের এক কঠিন অধ্যায়ের কথা শেয়ার করলেন জনপ্রিয় গায়িকা জেসমিন স্যান্ডলাস। 'জাইয়ে সাজনা' গানটি গেয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা জেসমিন (Jasmine Sandlas) সম্প্রতি জানিয়েছেন, কীভাবে মদের আসক্তি থেকে ধীরে ধীরে তিনি ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। তাঁর এই অভিজ্ঞতা সামনে এনেছে এক স্বাস্থ্য-সতর্কবার্তাও। মদের আসক্তি ধীরে ধীরে তছনছ করে শরীর ও মনকে।
স্বাভাবিক জীবন। ছবি: সংগৃহীত
শুরু একাকিত্ব থেকেই
জেসমিনের কথায়, মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর জীবনে মদের প্রবেশ। তাঁর আগে তিনি এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু জীবনের একাধিক ধাক্কা, পারিবারিক অশান্তি, বাবার মৃত্যু, হঠাৎ খ্যাতি- সব মিলিয়ে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েন। বাইরে থেকে সবকিছু ঝলমলে লাগলেও ভেতরে ছিল গভীর একাকিত্ব। তিনি স্বীকার করেছেন, সেই সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও তাঁর আফসোস আছে। তবে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করেছে।
শৈশবের ক্ষত, মানসিক শূন্যতা
জেসমিনের কথায়, ছোটবেলার কিছু মানসিক আঘাত তাঁর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ছিল। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাঁকে বারবার ভুল জায়গায় ভরসা খুঁজতে বাধ্য করে। সেই শূন্যতা থেকেই ধীরে ধীরে নেশার উপর নির্ভরতা তৈরি হয়।
আসক্তি শুধু অভ্যেস নয়, একটি রোগ
চিকিৎসকদের মতে, অ্যালকোহল আসক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক-শারীরিক সমস্যা। এটি ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কাজের ধরনে বদল আনে। জেসমিনের অভিজ্ঞতায়ও দেখা যায়, মানসিক চাপ, একাকিত্ব এবং অপূর্ণতা থেকে শুরু হওয়া অভ্যেস পরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
চেনা ছবি। ছবি: সংগৃহীত
শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব
দীর্ঘদিন মদ্যপান শরীরে একাধিক ক্ষতি কতে পারে-
- লিভারের গুরুতর সমস্যা, যেমন- ফ্যাটি লিভার ও সিরোসিস
- উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি
- হজমের সমস্যা ও পুষ্টির ঘাটতি
- ঘুমের ব্যাঘাত ও দুর্বলতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
এই ক্ষতিগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে বাড়ে, শুরুতে বোঝা যায় না।
ভিড়ের মাঝেও একা অনুভূতি
খ্যাতি, অর্থ, বন্ধু- সব কিছু থাকলেও ভেতরে ছিল নিঃসঙ্গতা। চারপাশে মানুষ থাকলেও তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন অনুভব করতেন। এই মানসিক অবস্থা অনেক সময় মানুষকে ভুল পথে ঠেলে দেয়, জেসমিনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধাক্কা
মদের আসক্তি শুধু শরীর নয়, মনকেও প্রভাবিত করে। দেখা দেয় অবসাদ বা উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি। বাড়ে একাকিত্বের অনুভূতি। কমে যায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। জেসমিন নিজেও বলেছেন, চারপাশে মানুষ থাকলেও তিনি ভেতরে ভেতরে একা বোধ করতেন, যা আসক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
কীভাবে বদল এল?
নিজের জীবনের মোড় ঘোরানোর পেছনে তিনি সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিয়েছেন তাঁর পরিবারকে, বিশেষ করে মা-কে। কঠিন সময়ে পরিবার তাঁকে দূরে সরিয়ে দেয়নি, বরং পাশে থেকেছে। তিনি জানিয়েছেন, আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক লড়াইও। প্রতিদিন নিজেকে সামলানো, পুরনো অভ্যেস থেকে বেরিয়ে আসা- সবটাই ছিল কঠিন। ইচ্ছাশক্তি এবং পরিবারের সমর্থন তাঁকে নতুন জীবন শুরু করার শক্তি দিয়েছে।
অন্ধকার যত গভীরই হোক, ফিরে আসার পথ সবসময় থাকে। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব?
জেসমিনের অভিজ্ঞতা যে পথগুলো সামনে আনল-
১. পরিবার ও সাপোর্ট সিস্টেম
কাছের মানুষ পাশে থাকলে সবই সহজ হয়। মানসিক নিরাপত্তা আসক্তি কাটাতে বড় ভূমিকা নেয়।
২. মানসিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং
থেরাপি বা কাউন্সেলিং আসক্তির মূল কারণ খুঁজে বের করতে সাহায্য করে।
৩. অভ্যেসে পরিবর্তন
নিয়মিত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা- এগুলো শরীরকে ডিটক্স করতে সাহায্য করে।
৪. ইচ্ছাশক্তি ও ধৈর্য
আসক্তি থেকে বেরনো একদিনে সম্ভব নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তন আনে।
৫. লজ্জার বিষয় নয়
জেসমিন স্যান্ডলাসের গল্প শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং একটি স্বাস্থ্য-সতর্কবার্তাও- অ্যালকোহল আসক্তি লজ্জার বিষয় নয়, এটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। সময়মতো সাহায্য নিলে সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনে ফেরা সম্ভব।
নতুন শুরু
আজ জেসমিন স্যান্ডলাস শুধু একজন সফল শিল্পী নন, তিনি এক লড়াই জিতে ফেরা মানুষ। আজ তিনি শুধু মঞ্চে গান গাইছেন না, নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অন্যদেরও সচেতন করছেন। তাঁর এই যাত্রা অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা। অন্ধকার যত গভীরই হোক, ফিরে আসার পথ সবসময় থাকে।
