রান্নাঘরের নুনই আজ স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় শত্রু। অথচ সমাধানটা খুবই সহজ, সাধারণ নুনের বদলে লো-সোডিয়াম নুনের ব্যবহার। এই ছোট্ট পরিবর্তনই স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পটাশিয়ামসমৃদ্ধ নুনের ব্যবহার স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় প্রায় ১৪ শতাংশ এবং হৃদরোগজনিত মৃত্যু ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এই ফল পেতে বড় কোনও ওষুধ বা জটিল চিকিৎসার দরকার নেই, শুধু নুনের বদলই যথেষ্ট।
লো-সোডিয়াম সল্ট সাবস্টিটিউটে সাধারণত ১৫-৩০ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইডের বদলে পটাশিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার করা হয়। এতে নুনের স্বাদ প্রায় একই থাকে, কিন্তু শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব অনেকটাই কমে।
ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসক ও গবেষকরা বলছেন, এই বিকল্প নুনের ব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং নিয়মিত ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। এ জন্য ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-সহ কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয় ভূমিকা দরকার।
এক বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে (যাঁদের কিডনির গুরুতর সমস্যা নেই) এই ধরনের নুন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। কারণ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদরোগ ও কিডনি রোগ প্রতিরোধের অন্যতম চাবিকাঠি।
ভারতে সমস্যা কোথায়?
একজন ভারতীয় গড়ে দিনে ৮-১১ গ্রাম নুন খান, যেখানে প্রস্তাবিত সীমা মাত্র ৫ গ্রাম। প্রায় ২৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এমনকী কিশোরদের মধ্যেও এই প্রবণতা বাড়ছে। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ২৭ শতাংশই হৃদরোগজনিত, যার বড় কারণ অতিরিক্ত নুন খাওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ সোডিয়াম আসে রান্নার সময় বা খাবার টেবিলে বাড়তি নুন যোগ করার মাধ্যমে। তাই ঘরে পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে কাজ করে এই নুন?
লো-সোডিয়াম নুনে সোডিয়ামের পরিমাণ কমিয়ে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেসিয়ামের মতো উপাদান যোগ করা হয়। এতে অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সোডিয়াম কমানো সম্ভব।
পটাশিয়াম শরীরে সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। এটি রক্তনালিকে প্রসারিত করে, শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দেয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
কিন্তু সমস্যা হল, ভারতীয়দের খাদ্যতালিকায় পটাশিয়ামের ঘাটতি রয়েছে। ফল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, এসব কম খাওয়ার কারণে গড়ে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পটাশিয়ামের চেয়ে অনেক কম পটাশিয়াম শরীরে পৌঁছয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের নুনের ব্যবহারে স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। ভারতের একটি গবেষণাতেও রক্তচাপ কমার প্রমাণ মিলেছে।
ছবি: সংগৃহীত
কিডনি নিয়ে উদ্বেগ কি সত্যি?
অনেকেই আশঙ্কা করেন, বেশি পটাশিয়াম শরীরে জমে (হাইপারক্যালেমিয়া) বিপদ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের কিডনির সমস্যা রয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। তবে নতুন নির্দেশিকা বলছে, অধিকাংশ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পটাশিয়াম গ্রহণ নিরাপদ। শুধু যাঁদের গুরুতর কিডনি রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লো-সোডিয়াম নুনকে সাধারণ ভোজ্য নুনের তালিকায় আনতে হবে এবং দাম রাখতে হবে সবার আয়ত্ত্বের মধ্যে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি যেন আয়োডিনযুক্ত হয়। কারণ, আয়োডিনযুক্ত নুন বহু বছর ধরে আমাদের দেশে গয়টার, মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা ইত্যাদি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আসছে।
এক চামচ নুন কমানো যতটা কঠিন, তার চেয়ে অনেক সহজ নুনের ধরন বদলানো। আর সেই ছোট সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে বড় রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে নীরবে বাড়ছে হৃদরোগ, এই পরিবর্তনটি হতে পারে একটি বড় প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
