স্তন ক্যানসার মানেই নারীর অসুখ, এই ধারণা আমাদের সমাজে এতটাই গেঁথে গেছে যে, পুরুষদের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রায় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ বাস্তব বলছে, পুরুষদেরও হতে পারে স্তন ক্যানসার। সংখ্যায় কম হলেও ঝুঁকি একেবারেই কম নয়, বিশেষ করে যখন তা দেরিতে ধরা পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, পুরুষদের স্তন ক্যানসার শতাংশের হিসেবে খুব অল্প অংশ জুড়ে থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ধরা পড়ে অ্যাডভান্স স্টেজে। আর তার বড় কারণ একটাই- লক্ষণকে অবহেলা।
ছবি: সংগৃহীত
কেন এই রোগ নীরবে এগিয়ে চলে?
সমস্যার শুরু ভুল ধারণা থেকে। বেশিরভাগ পুরুষই মনে করেন, স্তন ক্যানসার তাদের হতে পারে না। ফলে শরীরে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলেও সেটাকে গুরুত্ব দেয় না। এর সঙ্গে যোগ হয় সামাজিক সংকোচ। অনেকেই লজ্জা বা অস্বস্তির কারণে সমস্যার কথা কাউকে জানান না। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের অভাবও একটি বড় কারণ। সব মিলিয়ে রোগটি অনেক সময় নীরবে বাড়তে থাকে, যতক্ষণ না তা গুরুতর হয়ে ওঠে।
কোন লক্ষণগুলো সতর্কবার্তা দেয়?
পুরুষদের স্তন ক্যানসারের লক্ষণ খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে, কিন্তু শরীর আগেই কিছু ইঙ্গিত দেয়। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হল স্তনবৃন্তের নিচে একটি শক্ত, ব্যথাহীন গাঁট, যা ধীরে ধীরে বড় হতে পারে।
এছাড়া স্তনবৃন্তের আকৃতি বদলে যাওয়া, ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা ঘা কিংবা স্তনবৃন্ত থেকে স্রাব বের হওয়াও সতর্কবার্তা হতে পারে। এই লক্ষণগুলোতে তীব্র ব্যথা না থাকায় অনেকেই এগুলোকে গুরুত্ব দেন না, আর সেই ভুলই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
ছবি: সংগৃহীত
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
সব পুরুষের ঝুঁকি সমান নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যাদের পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও জরুরি।
এছাড়া কিছু শারীরিক ও জেনেটিক কারণ ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, স্থূলতা, লিভারের অসুখ বা আগে বুকে কোনও রেডিয়েশন নেওয়ার ইতিহাস। বিশেষ করে BRCA2 জিনের পরিবর্তন থাকলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তাই যাদের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাদের ক্ষেত্রে আগেভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
চিকিৎসা কতটা কার্যকর?
ভয়ের কিছু নেই, সময়ে ধরা পড়লে এই ক্যানসারের চিকিৎসা বেশ সফল হতে পারে। চিকিৎসার পদ্ধতি মূলত নারীদের মতোই এবং রোগের পর্যায় অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
সাধারণত সার্জারিই প্রধান ভরসা। এর সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি এবং হরমোনাল থেরাপি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ক্যানসার হরমোন-নির্ভর হওয়ায় হরমোনাল চিকিৎসা ভালো ফল দেয়।
ছবি: সংগৃহীত
সময়মতো ধরা পড়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত শনাক্তকরণ মানেই চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি। শুরুতেই ধরা পড়লে রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু দেরি হলে ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তখন চিকিৎসা জটিল হয়ে যায় এবং ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
সচেতন না হলে, ঝুঁকি থেকেই যায়
পুরুষদের মধ্যে স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনেকেই লক্ষণ দেখেও সেটাকে গুরুত্ব দেন না বা চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। মনে রাখা দরকার, শরীরে কখনও হঠাৎ করে পরিবর্তন দেখা দেয় না, তার আগে সতর্কবার্তা দেয়। সেই বার্তাগুলোকে বুঝে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
পুরুষদের স্তন ক্যানসার বিরল, কিন্তু অসম্ভব নয়। তাই 'এটা আমার হবে না' ভাবার কোনও সুযোগ নেই। শরীরের কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন, বিশেষ করে বুকে গাঁট বা ত্বকের পরিবর্তন দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ একটাই- সময়মতো সচেতনতা ও পদক্ষেপই পারে বড় বিপদ এড়াতে।
