পুরুষও গর্ভধারণের লক্ষণ অনুভব করেন! শুনতে অবাক লাগলেও, বাস্তবে এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে অনেক পুরুষেরই। চিকিৎসাবিজ্ঞান একে স্পষ্ট কোনও রোগ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও, এই অদ্ভুত অনুভূতির একটি নাম রয়েছে, কুভাড সিনড্রোম (Couvade Syndrome), বাংলায় যাকে বলে 'সহানুভূতিশীল গর্ভাবস্থা'।
গর্ভধারণ মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে নারীর শরীর ও মনের পরিবর্তনের এক দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু সেই পথচলায় কখনও কখনও সঙ্গীরাও অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে পড়েন। কেউ কেউ বলেন, প্রিয় মানুষের শরীরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি যেন তাঁদের নিজের ভেতরেও শোনা যায়। অকারণ বমিভাব, অদ্ভুত অদ্ভুত খাবারের প্রতি আকর্ষণ, হঠাৎ মেজাজের ওঠানামা বা অপ্রত্যাশিত ওজন বেড়ে যাওয়া- এসব লক্ষণ নাকি কিছু পুরুষও অনুভব করেন, যখন তাঁদের সঙ্গী সন্তানসম্ভবা।
ছবি: সংগৃহীত
কুভাড সিনড্রোম আসলে কী?
এ যেন এক অদ্ভুত ছায়া-গর্ভাবস্থা। যেখানে শরীর গর্ভধারণ করে না, কিন্তু মন আর অনুভূতি যেন সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে ধারণ করে। সাধারণত হবু বাবাদের মধ্যেই এই লক্ষণগুলি দেখা যায়। ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, পিঠে ব্যথা, খাদ্য়াভ্য়াসে পরিবর্তন- সব মিলিয়ে যেন এক অচেনা অথচ পরিচিত অনুভূতির ভিড়।
'কুভাড' শব্দটির শিকড় ফরাসি ভাষায়, যার অর্থ 'ডিমে তা দেওয়া' বা 'লালন করা'। একসময় বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বাবারা প্রতীকীভাবে গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের কিছু আচরণ অনুকরণ করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই সাংস্কৃতিক চর্চা বদলে গিয়ে আজকের এই মানসিক-শারীরিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
কতটা সাধারণ এই অভিজ্ঞতা?
গবেষণা বলছে, বিশ্বের নানা প্রান্তে বহু পুরুষই অন্তত একটি বা একাধিক লক্ষণ অনুভব করেন। কোথাও এই হার অর্ধেকেরও বেশি, কোথাও আবার তুলনামূলক কম। সংস্কৃতি, সামাজিক পরিবেশ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক- সবকিছুই যেন এই অভিজ্ঞতার তীব্রতা নির্ধারণ করে।
অনেক সময় পুরুষরা বুঝতেই পারেন না, তাঁদের এই অস্বস্তি বা পরিবর্তনগুলির পেছনে এমন কোনও নাম বা ব্যাখ্যা আছে। সাধারণত গর্ভাবস্থার শুরুতে এই লক্ষণগুলি বেশি দেখা যায়, মাঝের সময় কিছুটা কমে, আর শেষের দিকে আবার ফিরে আসতে পারে। শিশুর জন্মের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।
ছবি: সংগৃহীত
কেন এমন হয়?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। তবে কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে-
প্রথমত, মনস্তাত্ত্বিক কারণ। বাবা হওয়া এক পরিবর্তনের সূচনা। আনন্দ, উৎকণ্ঠা, দায়িত্ববোধ- সব মিলিয়ে এক জটিল আবেগের সূচনা হয়। সেই আবেগ কখনও কখনও শরীরের মধ্যেও প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয়ত, সহানুভূতি। প্রিয় মানুষটির প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি পরিবর্তন এত গভীরভাবে অনুভব করা- যেন নিজের শরীরেও তার ছাপ পড়ে। এই অনুভূতিকে কেউ কেউ বলেন 'কমপ্যাথি'- অন্যের অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে বয়ে নিয়ে চলা।
তৃতীয়ত, হরমোনের ভূমিকা। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, হবু বাবাদের শরীরেও নাকি হরমোনের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। কর্টিসল, প্রোল্যাকটিন বা টেস্টোস্টেরনের ওঠানামা তাঁদের মেজাজ, ঘুম বা খিদেতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
সংস্কৃতির সীমানা ছাড়িয়ে
এই অভিজ্ঞতা কেবল আধুনিক সময়ের নয়। ইতিহাসের পাতায়, নানা সমাজে এমন অনেক রীতির উল্লেখ আছে যেখানে বাবারা প্রতীকীভাবে গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন। কোথাও তা ছিল সুরক্ষার বিশ্বাস, কোথাও সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশের এক মাধ্যম। আজ সেই রীতিগুলি বদলেছে, কিন্তু অনুভূতিটা যেন রয়ে গেছে নিঃশব্দে, অদৃশ্যভাবে।
কুভাড সিনড্রোম এখনও এক রহস্য। এটি কি শুধুই মনের খেলা, নাকি শরীরও তার অংশীদার- তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, সন্তান আগমনের পথচলা কেবল একজনের নয়, দু'জনেরই। মায়ের শরীরে জন্ম নেয় নতুন প্রাণ, আর বাবার মনে জন্ম নেয় নতুন এক সত্তা। সেই জন্মের গল্প কখনও কখনও শরীরেও লেখা হয়ে যায় নীরবে।
