গলার ক্যানসার বললে প্রথমেই মনে আসে ধূমপান বা অতিরিক্ত মদ্যপানের কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ছবিটা দ্রুত বদলাচ্ছে। চিকিৎসকরা এখন দেখছেন, অনেক ক্ষেত্রেই গলার ক্যানসারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাস মুখ ও গলায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং অনেক সময় ঘনিষ্ঠ যৌন আচরণ, বিশেষ করে মুখমেহনের মাধ্যমেও তা ছড়াতে পারে। গত দু-দশকে বিভিন্ন দেশে এইচপিভি-সম্পর্কিত গলার ক্যানসারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও গবেষণা শুরু হয়েছে।
ছবি: প্রতীকী
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং বিভিন্ন ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আধুনিক সময়ে যে সব গলার ক্যানসারের ঘটনা ধরা পড়ছে, তার একটি বড় অংশের সঙ্গে এইচপিভি সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে এইচপিভি-১৬ নামের একটি স্ট্রেনকে এই ক্ষেত্রে দায়ী করা হচ্ছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই ভাইরাস মুখ ও গলায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং সাধারণত মুখমেহনে মাধ্যমে ছড়াতে পারে। ফলে চিকিৎসকেরা এখন গলার একটি নির্দিষ্ট অংশের ক্যানসারকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে বাধ্য় হচ্ছেন। গলার পেছনের যে অংশটিকে ওরোফ্যারিংস বলা হয়, যার মধ্যে টনসিল ও জিভের পিছনের অংশ রয়েছে, সেই জায়গায় হওয়া ক্যানসারের সঙ্গে এইচপিভির যোগ এখন স্পষ্টভাবে সামনে আসছে।
ছবি: প্রতীকী
স্বাস্থ্য গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ওরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসারের সঙ্গে এইচপিভি সংক্রমণের সম্পর্ক থাকতে পারে। কয়েক দশক আগে এই ধরনের ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে তামাককে ধরা হত। সেই তুলনায় এই পরিবর্তন চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে একটি বড় দৃষ্টিভঙ্গির বদল এনে দিয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মুখগহ্বরের এইচপিভি সংক্রমণ খুব বিরল নয়। অনুমান করা হয়, প্রায় ১০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩ থেকে ৪ শতাংশ নারীর শরীরে কখনও না কখনও এই ধরনের সংক্রমণ দেখা যেতে পারে। তবে আশার কথা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এক থেকে দু'বছরের মধ্যে নিজে থেকেই ভাইরাসটিকে নির্মূল করে দেয় এবং তা থেকে কোনও গুরুতর সমস্যা তৈরি হয় না।
তবুও গত দু'দশকে কয়েকটি দেশে এইচপিভি–সম্পর্কিত গলার ক্যানসারের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে দেখা গেছে। বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে তরুণ বয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যাদের অনেকেরই ধূমপান বা অতিরিক্ত মদ্যপানের মতো প্রচলিত ঝুঁকির কারণ নেই।
ছবি: প্রতীকী
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং পুরোপুরি বুঝতে আরও সময় লাগবে। কারণ সব এইচপিভি সংক্রমণ ক্যানসারে রূপ নেয় না। তবুও এই ভাইরাস ও গলার ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক সামনে আসায় চিকিৎসকেরা এখন সচেতনতা বাড়ানো, টিকাকরণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন।
গবেষকদের স্পষ্ট বক্তব্য, আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা জরুরি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের ধরন বদলায়, আর বিজ্ঞান সেই পরিবর্তনের কারণ খুঁজে বের করতেই নিরন্তর কাজ করে চলেছে।
