হাসপাতালের করিডরজুড়ে প্রতিদিনই শোনা যায় স্টেথোস্কোপের শব্দ, তাড়াহুড়োয় পায়ের আওয়াজ, আর জীবন বাঁচানোর নিরন্তর লড়াই। কিন্তু সেই লড়াইয়ের আড়ালেই যেন জমেছে এক অদৃশ্য ক্লান্তি। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা সেই অস্বস্তিকর বাস্তবকেই সামনে আনল। দেশের ৯১ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসক চান না তাঁদের সন্তান ভবিষ্যতে ডাক্তারি পেশায় আসুক।
বড় শহরের ঝকঝকে হাসপাতাল থেকে ছোট শহরের ব্যস্ত নার্সিংহোম, সব মিলিয়ে ১২০০-রও বেশি চিকিৎসকের মতামত নিয়ে তৈরি হয়েছে এই গবেষণা। ছ'মাস ধরে চলা সমীক্ষার ফলাফলে ফুটে উঠেছে এক গভীর হতাশার ছবি। যেখানে চিকিৎসা পেশা আর শুধু সেবা বা সম্মানের প্রতীক নয়, বরং অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে অবিরাম চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভরা প্রতিদিনের গল্প।
কাটুক ভয়, আশঙ্কার মেঘ। ছবি: সংগৃহীত
সমীক্ষা বলছে, ৯১.৪ শতাংশ চিকিৎসক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের সন্তানকে চিকিৎসক হতে উৎসাহ দেবেন না। একসময় যে পেশাকে অনেকেই স্বপ্নের পথ বলে মনে করতেন, আজ সেই পথের দিকেই অনেকে তাকাচ্ছেন দ্বিধা আর সংশয়ের চোখে।
চিকিৎসকদের জীবনে ‘বার্নআউট’ এখন প্রায় নিত্যসঙ্গী। দিনরাত ডিউটি, রোগীর অন্তহীন ভিড়, আর প্রতি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ—সব মিলিয়ে অনেকের মনেই জমছে ক্লান্তির ঘন মেঘ। রাতে ঘরের আলো নিভে গেলেও সেই ক্লান্তি যেন সহজে নেভে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়, আশঙ্কা। কখনও রোগীর মৃত্যু, কখনও চিকিৎসা নিয়ে অসন্তোষ—অনেক সময়ই তার রেশ গিয়ে পড়ে চিকিৎসকদের ওপর। ফলে অনেকেই প্রতিদিনের কাজের মধ্যেও এক অদৃশ্য আতঙ্ক বয়ে বেড়ান।
রয়েছে আইনি জটিলতার ঝুঁকিও। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া বহু চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাঁদের কর্মজীবনের কোনও না কোনও সময়ে তাঁদের আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি আইনি ঝুঁকির আশঙ্কাও রয়েছে।
আরও একটি পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে এই গবেষণায়। চিকিৎসকদের মতে, সমাজে চিকিৎসা পেশার প্রতি সাধারণের আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গাটি আগের মতো নেই। এই বিশ্বাসের ক্ষয় অনেকের মনেই তৈরি করেছে এক গভীর অনিশ্চয়তা।
আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ভারতীয় চিকিৎসকদের মধ্যে মানসিক চাপ ও পেশাগত হতাশার মাত্রা তুলনামূলক বেশি। বিশ্বের অনেক দেশ, যেখানে চিকিৎসকরা এখনও পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী, সেখানে ভারতের বহু চিকিৎসকই যেন নিজের পথ নিয়েই নতুন করে ভাবছেন।
চিকিৎসকের প্রতি থাকুক আস্থা, শ্রদ্ধা। ছবি: সংগৃহীত
সরকারি ও বেসরকারি—দুই স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিকিৎসকেরাই এই সমীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। মেডিসিন, সার্জারি, শিশুস্বাস্থ্য, স্ত্রীরোগ—বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের অভিজ্ঞতা নিয়েই তৈরি হয়েছে এই সামগ্রিক চিত্র। গবেষকদের মতে, এই সমীক্ষা শুধু চিকিৎসকদের মানসিক অবস্থার কথা বলছে না, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। কারণ যদি চিকিৎসকেরাই তাঁদের সন্তানদের এই পথ থেকে দূরে রাখতে চান, তবে আগামী দিনে দক্ষ চিকিৎসকের অভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসিক সহায়তা, অযথা আইনি চাপ কমানো এবং রোগী-চিকিৎসকের সম্পর্কের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ হাসপাতালের সেই করিডরগুলোতে প্রতিদিনই জন্ম নেয় আশার আলো। আর সেই আলো জ্বালিয়ে রাখেন যে মানুষগুলো তাঁদের স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখাও সমাজের দায়িত্ব।
