সুস্থ শরীরের জন্য নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি দরকার সঠিক খাদ্যাভ্যাস। আর সেই খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস বা ডিমের পাশাপাশি থাকা চাই পর্যাপ্ত পরিমাণ সবজি। কারণ সবজিতে থাকা বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবার শরীরকে দেয় প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান। প্রতিদিনের খাবারে সবজি না থাকলে যেন পাত অপূর্ণ। কিন্তু সেই সবজিই যদি শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দেয়? বেঙ্গালুরুর সাম্প্রতিক এক গবেষণা নতুন করে সেই আশঙ্কাকেই সামনে আনল। যেখানে দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া বেশ কিছু পরিচিত সবজিতে রয়েছে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা (Lead)। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—আমাদের প্রতিদিনের খাবার পাতে থাকা সবজি কতটা নিরাপদ?
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গালুরু ও আশপাশের বাজার থেকে ৭২টি সবজির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। তার মধ্যে ১৯টিতে পাওয়া গেছে ক্ষতিকর মাত্রায় সীসা। সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের প্রতিনিধিরা ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে এমনই একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। নমুনাগুলি পরীক্ষা করা হয় ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI)-স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে। পরীক্ষায় ১১ ধরনের ভারী ধাতু, ৩টি খনিজ এবং প্রায় ২৩০ ধরনের কীটনাশক খতিয়ে দেখা হয়।
সবচেয়ে বেশি সীসা বেগুনে
যে সব সবজিতে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বেগুন। রিপোর্ট অনুযায়ী, বেগুনে সীসার মাত্রা ১.৯৫৩ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ০.১ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি—অর্থাৎ, প্রায় ২০ গুণ বেশি। এছাড়া যেসব সবজিতে অতিরিক্ত সীসা ধরা পড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—লাউ, শিম, বিট, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম, লঙ্কা, শসা, পাটশাক, ওলকপি এবং স্কোয়াশ।
সবজিতে সীসা আসে কোথা থেকে?
মাটি বা সেচের জলে সীসা থাকলে গাছের শিকড় সেই ধাতু শোষণ করে নেয়। পরে তা সবজির ভেতরে জমা হয়। ফলে শুধু ধুয়ে বা খোসা ছাড়িয়ে সবজির ভেতরে থাকা সীসা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
ছবি: সংগৃহীত
কীটনাশক নিয়েও উদ্বেগ
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ৭০টি নমুনার মধ্যে ১০টিতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কীটনাশক রয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শরীরের জন্য কতটা বিপজ্জনক?
সীসা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মৃত্যুর সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে সীসার দূষণের যোগ ছিল।
শিশুরা এই দূষণের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শরীরে সীসা জমলে তা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়।
সমস্যা নতুন নয়
২০২৩ সালেও বেঙ্গালুরুর আশপাশে সবজিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা সামনে আসে। সেই গবেষণা করেছিল এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এরপর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত পরীক্ষার নির্দেশ দেয় ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল।
ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
- বিশেষজ্ঞদের মতে, সবজি রান্নার আগে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে অন্তত ময়লা ও কিছু ক্ষতিকর উপাদান দূর করা যায়।
- এছাড়া শিশুদের খাবারে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার রাখলে সীসার ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোই এই ধরনের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
