আন্তর্জাতিক নারীদিবস শুধু নারীর অধিকার বা সাফল্যের গল্প বলার দিন নয়, নিজের শরীরের প্রতিও নতুন করে দায়িত্ব নেওয়ার দিন। ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ ও পরিবারের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক সময়ই নারীরা নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেন। অথচ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা পরিবর্তন ঘটে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজন নিয়মিত কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায় নারীদের জন্য আলাদা কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ২০-র কোঠায় প্রজনন স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে ৪০-এর পরে ক্যানসার স্ক্রিনিং, আবার ৫০ ও ৬০-এর পরে হাড় ও হার্টের যত্ন—এই পরীক্ষাগুলো সময়মতো করলে অনেক রোগই শুরুতেই ধরা পড়ে। তাই নারীদিবসের বার্তাই হোক, নিজের যত্ন নেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
স্বাস্থ্য়কে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
বয়স ২০ পেরলে যেসব পরীক্ষা জরুরি
বিশের কোঠা মূলত সুস্থতার ভিত্তি তৈরি করার সময়। এই বয়সে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিয়মিত করা উচিত। এ সময় জরুরি পরীক্ষাগুলোর মধ্যে রয়েছে— সারভাইক্যাল ক্যানসার শনাক্তকরণে প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট, এইচপিভি ভ্যাকসিন, যৌন সংক্রমিত রোগের (এসটিআই) স্ক্রিনিং। এছাড়া রক্তে হিমোগ্লোবিন ও সুগার টেস্ট এবং থাইরয়েড ফাংশন টেস্টও দরকার। পাশাপাশি স্তনের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতা এবং নিয়মিত ব্রেস্ট সেলফ এগজামিনেশনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের কথায়, পিরিয়ড সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের ব্য়বধানে নিয়মিত হওয়া উচিত। যদি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত পিরিয়ড চলতে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
৩০-এ বাড়তি সতর্কতা
বয়স ৩০ মানেই প্রজনন স্বাস্থ্য ও মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি কিছুটা বাড়ার সময়। তাই এই সময় প্যাপ স্মিয়ার ও এইচপিভি টেস্ট নিয়মিত করা জরুরি। এ ছাড়া ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এগজামিনেশন, পারিবারিক ইতিহাস থাকলে আগে থেকেই ম্যামোগ্রাফি করা দরকার। আর কিছু রুটিন চেকআপ। যেমন— ব্লাড সুগার ও ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং, কোলেস্টেরল বা লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা এবং শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি আছে কিনা তার পরীক্ষা। যাঁরা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরীক্ষা এই বয়সে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়ন্ত্রণে রাখুন রক্তচাপ। ছবি: সংগৃহীত
৪০-এর পর জরুরি ক্যানসার স্ক্রিনিং
৪০-এর পরে শরীরে নানা হরমোনাল পরিবর্তন আসতে শুরু করে এবং পেরিমেনোপজের লক্ষণও দেখা দিতে পারে। তাই এই বয়সে জরুরি স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং। এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্তচাপ, ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং, লিপিড প্রোফাইল, থাইরয়েড টেস্ট এবং হরমোনাল পরীক্ষাও করা উচিত। যাঁদের অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে হাড়ের ঘনত্ব (বোন মিনারেল ডেনসিটি) পরীক্ষাও জরুরি।
৫০-এর গণ্ডি অতিক্রম করলে হাড় ও হৃদ্যন্ত্রে বিশেষ নজর
৫০ বছর বয়সে মেনোপজের পর হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া, হৃদ্রোগ এবং কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তাই চিকিৎসকেরা হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা, নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি, কোলন ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং হার্টের টেস্টের কথা বলেন। মেনোপজের সময় ঘুমের সমস্যা বা মানসিক অস্থিরতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৪০-এর পর চিকিৎসকের পরামর্শ মতো জরুরি স্তন ক্য়ানসার স্ক্রিনিং। ছবি: সংগৃহীত
৬০-এর পরেও নিয়মিত পরীক্ষা
এই সময় দীর্ঘদিন সুস্থতা ধরে রাখাই প্রধান লক্ষ্য। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন, এই বয়সে স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং, হাড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হৃদ্রোগ সংক্রান্ত পরীক্ষা, কিডনি ফাংশন টেস্ট, লিভার ফাংশন টেস্ট, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। এ ছাড়া মেনোপজের পর হঠাৎ ব্লিডিং বা রক্তপাত, দীর্ঘদিন পেট ফাঁপা বা অস্বাভাবিক কোনও উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
কেন প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সারভাইক্যাল ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, অস্টিওপোরোসিস এবং হৃদ্রোগের মতো অনেক গুরুতর অসুখ প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে। ফলে চিকিৎসা সহজ হয় এবং সুস্থ জীবনযাপনের সম্ভাবনাও অনেক বাড়ে।
সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই তিনটি বিষয়ই নারীদের দীর্ঘদিন সুস্থ ও সক্রিয় থাকতে নেয় সবচেয়ে বড় ভূমিকা।
