সকাল থেকে রাত- মিটিং, ডেডলাইন, টার্গেট আর অবিরাম কাজের চাপে আজ বহু নারীই ক্লান্ত। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও, শরীরের ভেতর নিঃশব্দে তৈরি হয় এক বড় সমস্যা। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বার্নআউট এবং অনিয়মিত জীবনযাপন নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় কাজ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং ক্রমাগত মানসিক চাপ শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পিরিয়ড, ওভ্যুলেশন বা ডিম্বস্ফোটন, এমনকী গর্ভধারণের সম্ভাবনার উপরও।
স্ট্রেসে কাহিল শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য। ছবি: সংগৃহীত
স্ট্রেস কীভাবে প্রভাব ফেলে?
চিকিৎসকদের মতে, নারীদের প্রজনন ব্যবস্থা সরাসরি মস্তিষ্কের সেই অংশগুলির সঙ্গে যুক্ত, যেগুলি শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। অতিরিক্ত চাপের সময়ে শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনচক্র ভেঙে পড়তে পারে। দেখা দেয় হরমোনে ভারসাম্যহীনতা। ফলে দেখা দিতে পারে-
- অনিয়মিত পিরিয়ড
- ওভ্যুলেশনে সমস্যা
- হঠাৎ মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া
- প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম
- গর্ভধারণে দেরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রেস একমাত্র কারণ না হলেও এটি গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
নাইট শিফট ও অতিরিক্ত কাজও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
যাঁরা নিয়মিত নাইট শিফটে কাজ করেন বা দীর্ঘক্ষণ অফিসে থাকেন, তাঁদের শরীরের ‘বডি ক্লক’ বা সার্কাডিয়ান রিদম বিঘ্নিত হতে পারে। এই জৈবিক ঘড়িই ঘুম, হরমোন এবং শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
অপর্যাপ্ত ঘুম ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ওভ্যুলেশনে এবং প্রজনন ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বিশেষ করে স্বাস্থ্য পরিষেবা, মিডিয়া, কর্পোরেট এবং হসপিটালিটি সেক্টরের কর্মরত নারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে। ছবি: সংগৃহীত
মানসিক ক্লান্তি শুধু মন নয়, শরীরও ভাঙে
টানা কাজের চাপ থেকে তৈরি হওয়া ‘বার্নআউট’ শুধু মানসিক ক্লান্তিই নয়, শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকেও নষ্ট করে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস-
- পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
- অনিয়মিত খাওয়া
- শরীরচর্চার অভাব
- অতিরিক্ত কফি বা ক্যাফেইন
- প্রসেসড খাবারের উপর নির্ভরতা
এই অভ্যাসগুলি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে ওজনের সমস্যা, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার এবং প্রজননজনিত জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কেরিয়ারের চাপে সমস্যায় মাতৃত্ব?
আজকের দিনে অনেক নারী কেরিয়ারকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেরিতে মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যদিও ৩০-এর পরেও সুস্থভাবে মা হওয়া সম্ভব, তবুও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই প্রজনন ক্ষমতা কমতে থাকে। তার উপর যদি অতিরিক্ত স্ট্রেস যোগ হয়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
তবে চিকিৎসকদের স্পষ্ট বার্তা, চাপযুক্ত চাকরি মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়। বরং সময়মতো শরীরের যত্ন নিলেই অনেক সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
জরুরি সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ। ছবি: সংগৃহীত
কী করলে কমবে ঝুঁকি?
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম
- পুষ্টিকর খাবার
- নিয়মিত শরীরচর্চা
- মেডিটেশন ও মানসিক বিশ্রাম
- কাজের মাঝে ছোট বিরতি
- কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন মাসিকের সমস্যা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা গর্ভধারণে সমস্যা হলে দ্রুত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
