সন্তান জন্মের পর সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নবজাতককে নিয়ে। কিন্তু এই সময়টাতে সন্তানের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যত্নের প্রয়োজন মায়েরও। কারণ গর্ভধারণ, প্রসব, রক্তক্ষরণ, হরমোনের পরিবর্তন, ঘুম না হওয়া আর নতুন জীবনের চাপ, সব মিলিয়ে প্রসবের পর নারীর শরীর ও মনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান জন্মের পর প্রথম ছ'সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক জটিলতা কয়েক মাস পরও দেখা দিতে পারে। তাই প্রসবের পর অতিরিক্ত ক্লান্তি, ব্যথা বা মানসিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়।
বাড়ে উদ্বেগজনিত সমস্যা। ছবি: প্রতীকী
জেনে নিন নতুন মায়েদের মধ্যে দেখা দেওয়া ৮টি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে-
১. বিষণ্নতা ও উদ্বেগ
সন্তান জন্মের পর অনেক মায়ের হঠাৎ কান্না পায়, মন খারাপ থাকে বা অকারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে এই অনুভূতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, হতাশা, খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের সমস্যা, সবকিছুতে অনীহা বা শিশুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া, এসব উপসর্গ অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসা ও পরিবারের মানসিক সমর্থন খুবই জরুরি।
২. প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা বা পেলভিক ফ্লোর দুর্বলতা
গর্ভাবস্থা ও নর্মাল ডেলিভারি পেলভিক ফ্লোরের পেশিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে হাঁচি-কাশি বা হাসির সময় প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়া, তলপেটে ভারীভাব অনুভব হওয়া বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। অনেক নারীই লজ্জায় এসব বিষয় কাউকে বলেন না। অথচ নিয়মিত ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি ও চিকিৎসায় এ সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
৩. সিজার বা সেলাইয়ের জায়গায় অস্বাভাবিক ব্যথা
সন্তান জন্মের পর ব্যথা স্বাভাবিক। কিন্তু সেলাইয়ের জায়গা অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ বের হওয়া বা জ্বর আসা সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে সিজারিয়ান অপারেশনের পর বিশ্রাম ও ক্ষতের সঠিক যত্ন না নিলে জটিলতা বাড়তে পারে।
গর্ভাবস্থাতেই নয়, প্রসবের পরও বাড়ে রক্তচাপ। ছবি: প্রতীকী
৪. অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
প্রসবের পর কিছুদিন রক্তপাত স্বাভাবিক। কিন্তু খুব দ্রুত প্যাড ভিজে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা বিপজ্জনক হতে পারে। এই ধরনের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণকে পোস্টপার্টাম হেমোরেজ বলা হয়, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
৫. সংক্রমণ
প্রসবের পর জরায়ু, মূত্রনালি বা সেলাইয়ের জায়গায় সংক্রমণ হতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা তীব্র ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সংক্রমণ অবহেলা করলে তা শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৬. বুকের দুধ খাওয়ানোতে জটিলতা
নতুন মায়েদের অনেকেই স্তন ফুলে যাওয়া, স্তনবৃন্ত ফেটে যাওয়া বা মাস্টাইটিসের মতো সমস্যায় ভোগেন। স্তনে তীব্র ব্যথা, জ্বর বা ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। সঠিকভাবে শিশুকে দুধ খাওয়ানো ও ল্যাকটেশন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।
দেখা দিতে পারে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা। ছবি: প্রতীকী
৭. থাইরয়েডের সমস্যা
সন্তান জন্মের পর কিছু নারীর থাইরয়েড হরমোনে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এতে হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, অস্থিরতা বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি ও বিষণ্নতাও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় সাধারণ প্রসব-পরবর্তী ক্লান্তির সঙ্গে এ লক্ষণগুলো মিশে যায় বলে রোগটি সহজে ধরা পড়ে না।
৮. উচ্চ রক্তচাপ ও পোস্টপার্টাম প্রি-এক্লাম্পসিয়া
গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেও সন্তান জন্মের পর হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তীব্র মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, শ্বাসকষ্ট, বুকেব্যথা, মুখ-হাত ফুলে যাওয়া ইত্যাদি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এই সমস্যা অবহেলা করলে খিঁচুনি, স্ট্রোক বা প্রাণহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মায়ের যত্নও সমান জরুরি
সন্তান জন্মের পর সবাই যখন নবজাতককে নিয়ে ব্যস্ত, তখন অনেক মায়ের কষ্ট চাপা পড়ে যায়। কিন্তু একজন সুস্থ মা-ই পারে একটি শিশুকে নিরাপদ ও সুন্দরভাবে বড় করে তুলতে। তাই প্রসবের পর অস্বাভাবিক কোনও উপসর্গ দেখা দিলে তা লুকিয়ে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, পরিবারের সহযোগিতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, এই সময়টায় একজন মায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
