শুরুতে ভেবেছিলেন সাধারণ জ্বর-কাশি। পরে সন্দেহ নিউমোনিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে বিরল ছত্রাকজনিত সংক্রমণ- 'ভ্যালি ফিভার'। আর তাতেই প্রাণ গেল ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত ৩৭ বছরের ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মী চিরঞ্জীবী কোল্লার।
প্রায় এক মাস আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন তিনি। তাঁর মৃত্যু সামনে আনল এমন এক রোগকে, যার নাম এখনও আমেরিকার বাইরে অনেক মানুষের কাছেই অজানা।
জ্বর-কাশির আড়ালে লুকিয়ে মারাত্মক অসুখ! ছবি: সংগৃহীত
কী এই ভ্যালি ফিভার?
ভ্যালি ফিভারের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম কক্সিডিওডোমাইকোসিস। এটি এক ধরনের ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে হয়। এই ছত্রাক মূলত শুকনো, ধুলোময় মাটিতে জন্মায় এবং আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া ও অ্যারিজোনায়।
মাটি খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণ ও কৃষিকাজ বা ঝোড়ো হাওয়ার কারণে যখন ধুলো উড়ে, তখন সেই ছত্রাকের অতি সূক্ষ্ম স্পোর বা ছত্রাক-রেণু বাতাসে মিশে যায়। শ্বাসের সঙ্গে সেই রেণু শরীরে ঢুকলে সংক্রমণের সূত্রপাত হতে পারে।
ফ্লুর মতো উপসর্গই বিপদের কারণ
এই রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এর উপসর্গ অনেকটাই সাধারণ ফ্লু বা নিউমোনিয়ার মতো। ফলে প্রথম দিকে রোগ ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। চিরঞ্জীবী কোল্লার ক্ষেত্রেও প্রথমে জ্বর, কাশির মতো স্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় জানা যায়, তিনি ভ্যালি ফিভারে আক্রান্ত।
ছত্রাকের খোঁজে । ছবি: সংগৃহীত
রোগের উপসর্গ
- জ্বর
- দীর্ঘদিনের কাশি
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- পেশি ও গাঁটে ব্যথা
অনেকের ক্ষেত্রে সংক্রমণ কম থাকলে, কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, ডায়াবেটিস বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে। কখনও কখনও ছত্রাক ফুসফুসের বাইরে শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর সংক্রমণে ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকী ফুসফুস বিকল হয়ে মৃত্যুও হতে পারে।
গুরুতর সংক্রমণে হাসপাতালে ভর্তি জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে রোগ ধরা পড়ে?
আমেরিকার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানাচ্ছে, সাধারণত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ওই ছত্রাকের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি খুঁজে রোগ নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজন হলে বুকের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, কফ পরীক্ষা বা ফুসফুসের টিস্যু পরীক্ষাও করা হতে পারে।
চিকিৎসা কী?
মৃদু সংক্রমণে অনেক সময় বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে ফ্লুকোনাজলের মতো অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়। অনেক রোগীকেই দীর্ঘদিন চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয়। গুরুতর সংক্রমণে হাসপাতালে ভর্তি করে অক্সিজেন বা ভেন্টিলেশনের সহায়তাও প্রয়োজন হতে পারে।
ভ্যালি ফিভার একজনের থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায় না। এটি শুধুমাত্র সংক্রমিত মাটির ধুলোর মাধ্যমে ছড়ায়। চিরঞ্জীবী কোল্লারের অকালমৃত্যু মনে করিয়ে দিল, কখনও কখনও সাধারণ জ্বর-কাশির আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক অসুখ।
