হৃৎপিণ্ড জন্ম থেকেই লাবডুব ছন্দে রক্ত পাম্প করে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন কারণে হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা অস্বাভাবিক হলে (হার্টব্লক) পেসমেকারের সাহায্য দরকার। এই বিষয়ে সবিস্তারে জানালেন সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. সরোজ মণ্ডল।
হৃৎপিণ্ড এমনই এক পাম্প যা থামলেই জীবনের ইতি। পাম্প চালাতে যেমন ইলেক্ট্রিসিটির প্রয়োজন হার্টের ক্ষেত্রেও তাই। সাধারণত বেশি বয়সে কখনও বা জন্মগত কারণে হার্টে ইলেকট্রিক সাপ্লাই কমে গেলে হার্ট ব্লক হয়। হৃৎপিণ্ডের পাম্প করার ক্ষমতা কমতে শুরু করে, ফলে মস্তিষ্ক সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত চলাচল কমে গিয়ে রোগী ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েন, শ্বাসকষ্ট হয়ে যখন তখন ব্ল্যাক আউট হয়ে যান। ওষুধ ও পেসমেকারের সাহায্যে এই সমস্যার চিকিৎসা করা হয়।
কাদের পেসমেকার দরকার
হাই রিস্ক রোগী যাঁদের হাইব্লাড প্রেশার, রাইট বান্ডল ব্র্যাঞ্চ ব্লক ও জটিল অ্যান্টেরিয়র বা পস্টেরিয়র ফ্যাসিক্যুলার ব্লক থাকে, সমস্যা বেড়ে কমপ্লিট হার্ট ব্লকের দিকে এগোয়, দুটি ক্ষেত্রেই মাঝে মাঝে সিনকোপ বা ব্ল্যাকআউট হয়, জন্মগত ভাবে হার্ট ব্লক থাকে, যাঁদের দিনভর শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা থাকে, তাঁদের পেসমেকার প্রতিস্থাপন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়। তবে কোন রোগীকে পেসমেকার দিয়ে চিকিৎসা করা হবে রোগীকে খুঁটিয়ে দেখে তবেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।
কাদের ঝুঁকি বেশি
হাইব্লাড প্রেশারের রোগীদের এই সমস্যার ঝুঁকি বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে। তবে ঠিক সময়ে অসুখ ধরা পড়লে এবং কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ মেনে চললে ভয়ের কিছু নেই। জন্মগত হার্ট ব্লক হলে অল্প বয়সেই পেসমেকার দরকার হয়।
কী ধরনের ব্লকে পেসমেকার জরুরি
মূলত তিন ধরনের ব্লক দেখা যায়। রাইট বান্ডল ব্র্যাঞ্চ ব্লক (আরবিবি), বাইফ্যাসিক্যুলার ব্লক এবং লেফট বাগুল ব্র্যাঞ্চ ব্লক (এলবিবি)। সব থেকে বেশি দেখা যায় আরবিবি। হাইব্লাড প্রেশারের রোগীদের এই সমস্যার ঝুঁকি বেশি। লেফট বান্ডল ব্লক থাকলে এঁদের হয় ইসকিমিক হার্ট ডিজিজ (অর্থাৎ হার্টের রক্তবাহী ধমনিতে প্লেক জমে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে) কিংবা কার্ডিওমায়োপ্যাথি অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের পেশি দুর্বল হয়ে পাম্পিং ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এলবিবির রোগীদের যদি মাথা ঘোরে বা ব্ল্যাক আউট হয়ে যায় এঁদের অবশ্যই পেসমেকার বসাতে হয়। বাইফ্যাসিক্যুলার হার্ট ব্লক থাকলে ১০ বছরের মধ্যে ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে কমপ্লিট হার্ট ব্লক হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া ও ব্ল্যাক আউটের ঝুঁকি বাড়ে। এঁদের পেসমেকার প্রতিস্থাপন করতে হয়।
বেশি বয়সে সমস্যা হলে
৭০-৮০ বছরে হার্টব্লক হয় ধীরে ধীরে, ফলে কষ্টটা শরীর কিছুটা মানিয়ে নেয়। লক্ষণ খুব একটা তীব্র হয় না। চলাফেরা করলে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, দুর্বলতা থাকে। রোগ বেড়ে গেলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় টেস্ট করে পেসমেকার বসাতে বলেন। পেসমেকার প্রতিস্থাপনের ২-৩ দিনের মধ্যে রোগী বাড়ি ফিরতে পারেন। ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করতে পারেন।
হার্ট ব্লকের চিকিৎসায় প্রধানত দু'রকম পেসমেকার ব্যবহার করা হয়। সিঙ্গল চেম্বার এবং ডুয়েল চেম্বার। সিঙ্গল চেম্বার মানে হার্টের একটা চেম্বারে ইলেকট্রিক ইম্পালস পাঠানো হয়, ডুয়েলে দুটোটেই। ভালো কাজ করার জন্য সিঙ্গল ও ডুয়েল চেম্বার দুইয়ের সঙ্গে রেট রেসপনসিভপেসমেকার জুড়ে দিয়ে রোগীকে আরও বেশি ভালো রাখা যাচ্ছে। যেসব বয়স্ক মানুষ বাড়িতে থাকেন, অল্পস্বল্প কাজ করেন তাঁর এক ধরনের শক্তি দরকার, অন্যদিকে যারা দৌড়ঝাঁপ করেন তাঁর বেশি শক্তির পাম্প দরকার। যার যেমন রোগ, যেমন জীবনযাপন তা জেনে নিয়ে রেট রেসপনসিভপেসমেকার বসাতে হয়। এছাড়া আছে অত্যন্ত ক্ষুদ্র লিডলেস পেসমেকার, তার না থাকায় রোগীর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে না। রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। ভালো থাকতে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হেল্প লাইন: 8100355534
