পাঁঠার মাংস বা অন্যান্য রেড মিট অনেকেরই খুব পছন্দের খাবার। কষা, কারি, স্টু, চাপ, রেজালা, রোগান জোশ–জিভে জল আনা মটনের রকমারি সব পদের ছড়াছড়ি। কিন্তু বেশি খেলেই শরীরের দফারফা। দেখা দিতে পারে একাধিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। ব্রিটিশ জার্নাল অফ নিউট্রিশনে প্রকাশিত সমীক্ষা রিপোর্টে মিলেছে তেমনই ইঙ্গিত। তাদের প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত রেড মিট খেলে টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, শুধু রেড মিট খাওয়াই নয়, কতটা পরিমাণে এবং কত ঘনঘন খাচ্ছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। রেড মিটের পরিমাণ যত বাড়বে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকবে। তবে খাদ্যাভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই, এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেড মিটের বদলে ডাল, মাছ বা মুরগির মাংসের মতো স্বাস্থ্যকর প্রোটিন বেছে নিলে শরীরের জন্য তা অনেক বেশি উপকারী।
দেখলেই জিভে জল! একটু সমঝে। ছবি: সংগৃহীত
মটন কীভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়
রেড মিটে কার্বোহাইড্রেট না থাকায় এটি ভাত, রুটি বা মিষ্টির মতো সঙ্গে সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না। কিন্তু শরীরের ভেতর কিছু জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি পরোক্ষে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে ইন্ধন জোগায়। রেড মিট খাওয়ার পর, পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকা উৎসেচক বা এনজাইম (যেমন পেপসিন, ট্রিপসিন) প্রোটিনকে ভেঙে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করে। অতিরিক্ত কিছু অ্যামিনো অ্যাসিডকে লিভার গ্লুকোজে রূপান্তর করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় গ্লুকোনিওজেনেসিস। ফলে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে।
এছাড়া বেশি প্রোটিন খেলে শরীরে গ্লুকাগন নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন লিভারকে সংকেত দেয় জমে থাকা গ্লুকোজ রক্তে মিশিয়ে দিতে। এতে শরীরের শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে।
বাড়তে পারে শরীরের প্রদাহ
প্রসেসড রেড মিটে সাধারণত থাকে নাইট্রেট, বিভিন্ন প্রিজারভেটিভ এবং অতিরিক্ত সোডিয়াম। এসব উপাদান শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের প্রদাহ শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ায়। তার সঙ্গে প্রসেসড মাংসে অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণও বেশি থাকে। এতে ওজন বাড়তে পারে এবং পেটে মেদ জমতে শুরু করে। আর পেটের এই অতিরিক্ত মেদ ডায়াবেটিসের অন্যতম বড় কারণ।
ছবি: সংগৃহীত
স্যাচুরেটেড ফ্যাটের প্রভাব
রেড মিটে থাকা স্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট খেলে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে বিপাকজনিত নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
কতটা খাচ্ছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ
নিয়মিত বেশি পরিমাণে রেড মিট খাওয়া শরীরের ওপর অতিরিক্ত বিপাকীয় চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যদি খাদ্যতালিকায় থাকে প্রসেসড খাবার, কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট এবং ফাইবারের ঘাটতি, তাহলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
ডায়েটে থাকুক ভারসাম্য। ছবি: সংগৃহীত
প্রোটিনের ভারসাম্য রাখার উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটিনের উৎসে বৈচিত্র্য রাখা সবচেয়ে ভালো উপায়। ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন এবং বাদামের মতো উদ্ভিজ প্রোটিনে থাকে প্রচুর ফাইবার, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং নানা উপকারী পুষ্টি উপাদান। এগুলো বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। ফাইবার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রক্তে গ্লুকোজের শোষণ ধীর করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। অন্যদিকে মাছ ও মুরগির মাংসে তুলনামূলকভাবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম থাকে, তাই এগুলোও রেড মিটের ভালো বিকল্প হতে পারে।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জীবনযাপনের ভূমিকা
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে শুধু মটনে নিয়ন্ত্রণই একমাত্র উপায় নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা—এই তিনই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট খাদ্যাভ্যাসই ভবিষ্যতের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করে। তাই প্রোটিনের উৎসে ভারসাম্য রাখা এবং সচেতনভাবে খাবার বেছে নেওয়াই সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।
