সঠিক সময় স্ক্রিনিংয়ে প্রতিরোধ সম্ভব। চিকিৎসাও এখন টার্গেটেড। ফুসফুস ক্যানসারের প্রকৃতি পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করলেন রুবি জেনারেল হসপিটালের পালমোনোলজিস্ট ডা. শুভঙ্কর চক্রবর্তী
গত দশ বছরে ফুসফুসের ক্যানসারের ধরনে স্পষ্ট বদল এসেছে। আগে মূলত ধূমপানই ছিল প্রধান কারণ, এখন ছবিটা অনেকটাই পাল্টেছে। এক সময় স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বেশি দেখা যেত, যা সরাসরি ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত। এখন তুলনামূলকভাবে বাড়ছে অ্যাডেনোকার্সিনোমা, যার ক্ষেত্রে ধূমপানের সরাসরি সম্পর্ক অনেক সময় থাকে না। বরং পরিবেশ দূষণ, পরোক্ষ ধূমপান, বায়োমাস ফুয়েলের ধোঁয়া এ সব বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
আগে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসার বেশি দেখা গেলেও এখন ধূমপান না করা মহিলাদের মধ্যেও রোগ বাড়ছে। পরিবেশগত দূষণ বৃদ্ধির পাশাপাশি, আধুনিক স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ায় মহিলাদের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ও বেশি হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিন কাঠকয়লা বা বায়োমাস জ্বালানিতে রান্নার ফলে ফুসফুসের উপর যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, তা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া ঘরের ভেতর রেডন গ্যাসের সংস্পর্শ ফুসফুসের ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। জেনেটিক কারণ থাকতে পারে, তবে তা তুলনায় বিরল। মূল দায়ী ধূমপান ও দূষণ।
ছবি: প্রতীকী
কেন দেরিতে ধরা পড়ে?
ভারতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ে স্টেজ ৩ বা ৪-এ। ফলে সম্পূর্ণ নিরাময়ের সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। প্রথম পর্যায়ে সাধারণত কোনও উপসর্গ থাকে না। কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা ফুসফুসে জল জমা এসব লক্ষণ দেখা দিলে বেশিরভাগ সময় রোগ স্টেজ ৩ বা ৪-এ পৌঁছে যায়। স্টেজ ১-এ যদি ধরা পড়ে এবং ক্যানসার শরীরের অন্যত্র না ছড়ায়, তা হলে শুধু অস্ত্রোপচার করেই দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হল, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়া কঠিন।
স্ক্রিনিংয়ের সীমাবদ্ধতা
আমেরিকার মতো দেশে বছরে একবার লো-ডোজ সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং করা হয়। যাঁদের বয়স সাধারণত ৫০ থেকে ৮০-র মধ্যে এবং বছরে ২০ প্যাকের বেশি ধূমপায়ী বা বর্তমানে ধূমপান করছেন বা বিগত ১৫ বছরের কম সময়ের মধ্যে ধূমপান ছেড়েছেন-তাঁদের এই স্ক্রিনিং প্রোটোকলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতে এখনও এই ধরনের সুসংগঠিত স্ক্রিনিং প্রোটোকল চালু হয়নি। রয়েছে পরিকাঠামো ও সচেতনতার ঘাটতি। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। এখন দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় কম বয়সেও ক্যানসার হচ্ছে। আগে ৬০-৭০ বছরে বেশি ধরা পড়ত, এখন ৫০-৫৫ বছর বয়সেও দেখা যাচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
কোভিডের সঙ্গে যোগ
কোভিড-পরবর্তী সময়ে ফুসফুসে ফাইব্রোসিস বা সংক্রমণের প্রবণতা কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। তবে কোভিডের কারণে সরাসরি ফুসফুসের ক্যানসার বেড়েছে- এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই। ফাইব্রোসিস থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু তা খুবই সীমিত।
চিকিৎসায় নতুন দিশা
আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একই ধরনের কেমোথেরাপি দেওয়া হত। এখন চিকিৎসা অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (এনজিএস) পদ্ধতিতে দেখা হয় ক্যানসারের পেছনে নির্দিষ্ট কোনও জিন মিউটেশন রয়েছে কি না। থাকলে সেই অনুযায়ী টার্গেটেড থেরাপি দেওয়া হয়। ইমিউনোথেরাপিও এখন উন্নত পর্যায়ে এসেছে। স্টেজ ৪ ক্যানসার হলেও অনেক রোগী দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন। আগের তুলনায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই কম এবং চিকিৎসার ফলও ভাল।
ফুসফুস সুস্থ রাখতে
- ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন
- পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন
- কাঠকয়লা বা বায়োমাস জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহ দিন
- দূষিত এলাকায় বেরলে মাস্ক ব্যবহার করুন। এন-৯৫ সব সময় না হলেও সাধারণ মাস্কও
- কিছুটা সুরক্ষা দেয় বয়স্কদের ক্ষেত্রে
- ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এখন ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের নিয়মিত ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়
- ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে যাঁদের হার্ট, ফুসফুস বা কিডনির ক্রনিক অসুখ রয়েছে, তাঁদেরও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত।
সময় বদলাচ্ছে। ঝুঁকি বদলাচ্ছে। রোগীর প্রোফাইল বদলাচ্ছে। চিকিৎসাও বদলাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, সচেতনতা ও আগাম সতর্কতাই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
