একটা সময় ছিল যখন কানে কম শোনা বা শ্রবণশক্তি হ্রাসকে (Hearing Loss) বয়সজনিত সমস্য়া বলেই ধরা হত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তরুণের মধ্যেও বাড়ছে এই সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্টফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ধরে হেডফোন বা ইয়ারবাড ব্যবহারের অভ্যেসই এর অন্য়তম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনও না কোনও শ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন। কানের সংক্রমণ, অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শে থাকা বা দীর্ঘ সময় হেডফোন ব্যবহারের মতো অনেক কারণই এই সমস্যার জন্য দায়ী, যেগুলোর বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময়ই আমরা উপেক্ষা করি।
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল 'গ্লোবাল হেলথ'-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বিশ্বে এক বিলিয়নেরও বেশি কিশোর ও তরুণ শ্রবণশক্তি হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দীর্ঘ সময় ইয়ারফোন ব্যবহার এবং উচ্চমাত্রায় শব্দের কাছাকাছি থাকা, যেমন কনসার্ট বা লাউড মিউজিকের কোনও অনুষ্ঠান। বিশেষজ্ঞদের কথায়, আমাদের সহনশীল শব্দের মাত্রা ৮০ ডেসিবেলের নিচে থাকা উচিত। কিন্তু অনেকেই বুঝতে না পেরে তার চেয়ে বেশি ভলিউমে দীর্ঘ সময় ধরে গান বা কোনও অডিও শোনেন। শুধু শব্দের তীব্রতাই নয়, কতক্ষণ এবং কত ঘন ঘন সেই শব্দের সংস্পর্শে থাকছেন, সেটাও শ্রবণশক্তির ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
হেডফোনের কারণে 'নয়েজ-ইনডিউসড হিয়ারিং লস'
উচ্চমাত্রায় শব্দের কারণে যে শ্রবণশক্তির হ্রাস পায়, তাকে বলা হয় 'নয়েজ-ইনডিউসড হিয়ারিং লস'। উচ্চমাত্রার শব্দে বারবার বা দীর্ঘ সময় থাকার ফলে কানের ভেতরের সূক্ষ্ম কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই কোষগুলো আর পুনরুদ্ধার করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অনেক তরুণ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে ইয়ারফোন ব্যবহার করছেন- কাজের কারণে, গান শোনা, ভিডিও দেখা কিংবা গেম খেলার জন্য। ফলে কানের ভেতরের সংবেদনশীল কোষগুলোর ওপর ক্রমাগত চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে স্থায়ী ক্ষতি হতে থাকে। ২০২১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আশপাশে অতিরিক্ত শব্দের মাঝে ইয়ারফোন ব্যবহার করেন, তাঁদের শ্রবণশক্তি কমার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৪.৫ গুণ বেশি।
ছবি: সংগৃহীত
কোন ধরনের হেডফোন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
হেডফোন সাধারণত তিন ধরনের। ইন-ইয়ার, অন-ইয়ার এবং ওভার-ইয়ার। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ভলিউমে এবং একই সময় ব্যবহৃত হলে তিন ধরনের হেডফোনেই কানের উপর সমান চাপ পড়তে পারে। তবে অনেকের মতে, ওভার-ইয়ার হেডফোন তুলনামূলকভাবে কিছুটা নিরাপদ, কারণ এতে শব্দ সরাসরি কানের ভেতরে প্রবেশ করে না। অন্যদিকে ইয়ারবাড বা ইন-ইয়ার ডিভাইস সরাসরি কানের ভেতরে বসে থাকার কারণে শব্দের তীব্রতা বেশি অনুভূত হতে পারে।
অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন প্রযুক্তিযুক্ত হেডফোন অনেক ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। এটি বাইরের শব্দ কমিয়ে দেয়, ফলে ব্যবহারকারীকে ভলিউম খুব বেশি বাড়াতে হয় না। তবে যদি কেউ অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন হেডফোন ব্যবহার করেও খুব বেশি ভলিউমে গান শোনেন, তাহলে ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যায়।
ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে রক্ষা করবেন শ্রবণশক্তি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রবণশক্তি হ্রাস সাধারণত স্থায়ী হলেও সঠিক অভ্যেস গড়ে তুললে তা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল '৬০-৬০ নিয়ম'। অর্থাৎ, হেডফোনের ভলিউম সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে এবং একটানা ৬০ মিনিটের বেশি ব্যবহার করা যাবে না। এর পাশাপাশি প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিটের বিরতি নেওয়াও কানের জন্য উপকারী। যদি কানে অবিরাম ভোঁ ভোঁ শব্দ শোনা যায়, কথাবার্তা স্পষ্টভাবে শুনতে সমস্য়া হয় বা শ্রবণক্ষমতায় পরিবর্তন অনুভূত হয়, তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকদের কথায়, আজকের ডিজিটাল জীবনে হেডফোন পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন হলেও সচেতন ব্যবহারই পারে ভবিষ্যতে শ্রবণ সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে। শব্দের আনন্দ উপভোগ করুন, কিন্তু নিজের কানের ক্ষতি করে নয়।
