রোলার কোস্টারে (Roller Coaster) ওঠার পর কয়েক মিনিটের রোমাঞ্চ। কখনও খাড়াভাবে নীচে নামা, কখনও প্রচণ্ড গতিতে বাঁক নেওয়া, আবার কখনও আচমকা দিক বদল। যাঁদের কাছে এই অভিজ্ঞতা নিখাদ আনন্দ, তাঁদের জন্যই ক্যালিফোর্নিয়ার একটি রোলার কোস্টারে ঘটে যাওয়া ঘটনা তৈরি করেছে উদ্বেগ।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সিক্স ফ্ল্যাগস ম্যাজিক মাউন্টেনের ‘এক্স-২’ রোলার কোস্টারে চড়ার কয়েক দিনের মধ্যে দুই মহিলা গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের শিকার হন। গত মাসে দু’জনেরই চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, দু’জনের মস্তিষ্কে যে ধরনের আঘাত দেখা গিয়েছে, তা অনেকটা দ্রুতগতির গাড়ি দুর্ঘটনা বা প্রবল আঘাতের ক্ষেত্রে দেখা যায়। অথচ কোনও মহিলারই গাড়ি দুর্ঘটনা, পড়ে যাওয়া বা একই ধরনের কোনও বড় আঘাতের ইতিহাস ছিল না। দু’জনেই এক্স-২ রাইডে চড়েছিলেন।
কয়েক মিনিটের রোমাঞ্চে দেখা দিতে পারে মস্তিষ্কে সমস্যা। ছবি: সংগৃহীত
এত গতিতে মস্তিষ্কে কী ঘটে?
রোলার কোস্টারের তীব্র গতিতে শুধু শরীর নয়, মাথাও দ্রুত সামনে-পিছনে বা বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করে। বিশেষ করে আচমকা গতি বাড়া বা কমা এবং দ্রুত দিক পরিবর্তনের সময় শরীরের উপর তৈরি হয় জি-ফোর্স।
খুলি মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু আচমকা গতি কমার ফলে মস্তিষ্কের টিস্যু ও তার আশপাশের রক্তনালিতে চাপ তৈরি হতে পারে। মাথার দ্রুত নড়াচড়ার কারণে মস্তিষ্ক খুলির ভিতরের অংশে ধাক্কা খেলে কখনও গুরুতর আঘাতও লাগতে পারে।
এই ধরনের আঘাতের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভিতরে বা তার চারপাশে রক্তক্ষরণ হতে পারে। রক্তক্ষরণ বেশি হলে খুলির ভিতরে চাপ বেড়ে গিয়ে মস্তিষ্কের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে। তাই এটি এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
তবে দুই মহিলার ক্ষেত্রে রোলার কোস্টারই রক্তক্ষরণের সরাসরি কারণ, এমনটা এখনও নিশ্চিত নয়। মস্তিষ্কের রক্তনালির কোনও অস্বাভাবিকতা, আগে থেকে থাকা শারীরিক সমস্যা বা অন্য কোনও কারণও এর নেপথ্যে থাকতে পারে। রোলার কোস্টারের সঙ্গে আঘাতের সম্পর্ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আরও তদন্ত।
শুধু রোমাঞ্চ নয়, সচেতনতাও জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
কেন নজরে এক্স-২?
এক্স-২-কে সাধারণ রোলার কোস্টারের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র রাইড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে আসনে বসে ঘোরা, রয়েছে খাড়াভাবে নিচে নামা এবং দ্রুত গতিতে দিক পরিবর্তন। ফলে রাইড চলাকালীন যাত্রীরা একাধিক ধরনের তীব্র গতির মুখোমুখি হন। এই ঘটনা সমানে আসার পর সেখানে বন্ধ করা হয় এই রাইড। তদন্ত শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়ার ডিভিশন অফ অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ।
রাইডের পর কোন লক্ষণ বিপদের?
রোলার কোস্টারে চড়ার পর মাথা ঘোরা বা সাময়িক অস্বস্তি হতে পারে। কিন্তু কিছু লক্ষণ একেবারেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।
হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, বারবার বমি, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, শরীরের কোনও অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা, দৃষ্টিতে পরিবর্তন এবং অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে রাইডের পর এমন উপসর্গ শুরু হলে সেটিকে শুধুমাত্র ‘ঝাঁকুনির প্রভাব’ ভেবে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা গুরুতর মাথার আঘাতের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাইড শেষে শারীরিক সমস্যাকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
রোমাঞ্চের আগে সতর্কতাও জরুরি
রোলার কোস্টার সাধারণত নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মান মেনেই তৈরি এবং পরিচালিত হয়। তাই এই ঘটনা থেকে সব ধরনের রোলার কোস্টারকে বিপজ্জনক বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তবে একই রাইডে চড়ার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই মহিলার গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঘটনা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। এক্স-২-এর গতি ও জি-ফোর্সের সঙ্গে তাঁদের আঘাতের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তার উত্তর মিলবে তদন্তেই।
রোমাঞ্চের জন্য রাইডে উঠলেও শরীরের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ মাথায় আঘাতের ক্ষেত্রে কয়েকটি লক্ষণই কখনও কখনও বড় বিপদের প্রথম সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
