গরম মানেই তৃষ্ণা, ক্লান্তি আর সেই চিরচেনা স্বস্তি- তরমুজ। এক টুকরো তরমুজে শরীর জুড়ে নামে স্বস্তি। কিন্তু এই সুস্বাদু রসালো ফলই কখনও কখনও হয়ে উঠতে পারে বিপদের কারণ, যদি অজান্তে এতে ঢুকে পড়ে ক্ষতিকর জীবাণু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরমুজ নিজে নয়, বরং এর ভুল ব্যবহারই তৈরি করে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যা ভয়াবহ রূপও নিতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
তরমুজ খেয়ে মৃত্যু!
গরমের এই আতঙ্কের মাঝেই সামনে এসেছে আরও এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা তরমুজ নিয়ে মানুষের মনে নতুন করে ভয় তৈরি করেছে। নবি মুম্বইয়ে তরমুজ খাওয়ার পর একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়েছে।
জানা গিয়েছে, রাতে বাড়িতে আত্মীয়দের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন। গভীর রাতে তরমুজ খাওয়ার পরই তাঁদের বমি, ডায়রিয়া ও তীব্র শারীরিক অসুস্থতা শুরু হয়। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারজনের মৃত্যু হয়। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে এই মৃত্যু শুধুমাত্র তরমুজের কারণে হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ফরেনসিক দল মৃতদের বাড়ি থেকে তরমুজ-সহ বিভিন্ন খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
তরমুজ কি সত্যিই বিপজ্জনক?
সাধারণভাবে তরমুজ সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু এর ভেতরে থাকা প্রচুর জল ও প্রাকৃতিক চিনি জীবাণুর বংশবৃদ্ধির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে, বিশেষ করে যখন এটি কাটা হয় বা দীর্ঘক্ষণ খোলা অবস্থায় থাকে। দূষিত তরমুজে সালমোনেলা, লিস্টেরিয়া বা ই. কোলাই-এর মতো ব্যাকটেরিয়া ঢুকে পড়লে শুরু হতে পারে বিষক্রিয়া।
লক্ষণ হঠাৎই দেখা দেয়
বারবার পাতলা পায়খানা, বমি, পেট মোচড়ানো ব্যথা, জ্বর। অনেকেই এটিকে হালকা সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান, কিন্তু সবসময় তা নিরাপদ নয়।
কখন ঝুঁকি বাড়ে?
প্রথমে বিষয়টি তুচ্ছ মনে হলেও, কিছু পরিস্থিতিতে তা দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে-
- শরীর থেকে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে গিয়ে ডিহাইড্রেশন পরিস্থিতি তৈরি হলে
- সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে সেপসিসের রূপ নিলে
- রোগী যদি শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী বা কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হন
এই অবস্থায় সময়মতো চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই উপসর্গকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়।
ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে নিরাপদ ফল হয়ে ওঠে ঝুঁকির কারণ?
- তরমুজের বিপদ লুকিয়ে থাকে এর বাইরের স্তর ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে। অপরিষ্কার ছুরি বা হাত থেকে জীবাণু সরাসরি ফলের ভেতর যেতে পারে।
- মাটিতে বা দূষিত জলে থাকা ব্যাকটেরিয়া খোসায় লেগে থাকে, যা কাটার সময় ভেতরে ঢুকে পড়ে।
- কিছু ক্ষেত্রে মিষ্টতা বাড়াতে ইনজেকশন দিয়ে জল বা রাসায়নিক ঢোকানো হয়, যা অস্বাস্থ্যকর হলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
- সবচেয়ে বড় ভুল, কাটা তরমুজ দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া। এই সময়েই দ্রুত জীবাণুর বিস্তার ঘটে।
রাতে তরমুজ খাওয়া ক্ষতিকর- মিথ না সত্য?
সময় নয়, আসল সমস্যা বিষক্রিয়া। রাতে খেলে বিষক্রিয়া হয় না, তবে তরমুজে যদি জীবাণু বাসা বাধে, আর সেটা যদি খান, তাহলে রাতের ধীর হজম প্রক্রিয়ার কারণে অস্বস্তি বেশি তীব্র হতে পারে এবং সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই দিনের বেলায়, সতেজ তরমুজ খাওয়াই ভালো।
ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে থাকবেন নিরাপদ?
সচেতন হলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়-
- তরমুজ কাটার আগে খোসা ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
- পরিষ্কার ছুরি ব্যবহার করুন।
- কাটা তরমুজ কখনও বাইরে ফেলে রাখবেন না, দ্রুত ফ্রিজে রাখুন।
- রাস্তার ধারের কাটা ফল বা অস্বাস্থ্যকর উৎস এড়িয়ে চলুন।
- সবসময় তাজা ফল কিনুন।
তরমুজ ভয় পাওয়ার মতো ফল নয়, কিন্তু সচেতনতার অভাবেই দেখা দেয় বিপদ। এই গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে তরমুজের বিকল্প কম, তবে তার আগে নিশ্চিত করুন, প্রতিটি টুকরোই নিরাপদ। কারণ কখনও কখনও সবচেয়ে নিরীহ জিনিসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
