বর্ষা এলেই রাস্তাঘাটে জল জমা যেন নিত্যদিনের ছবি। অফিস, স্কুল বা জরুরি কাজে বেরিয়ে অনেক সময় বাধ্য হয়েই সেই জল মাড়িয়ে চলতে হয়। কিন্তু এই জল যে শুধু কাদা বা আবর্জনায় ভরা, তা নয়। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, জমা জলে লুকিয়ে থাকতে পারে লেপ্টোস্পাইরোসিস (Leptospirosis)-এর মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া, যা সময়মতো চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে ইঁদুরসহ বিভিন্ন সংক্রমিত প্রাণীর প্রস্রাব বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে রাস্তাঘাট, কাদা ও জমে থাকা জলে ছড়িয়ে পড়ে। সেই দূষিত জলের সংস্পর্শে এলেই বাড়ে সংক্রমণের আশঙ্কা। তবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মেনে চললে এই রোগ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
লেপ্টোস্পাইরোসিস কী?
লেপ্টোস্পাইরোসিস হল লেপ্টোস্পাইরা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হওয়া একটি রোগ। বর্ষা ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় এই রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। দূষিত জল, কাদা বা ভেজা মাটির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়।
জমা জল মাড়ালেই কি এই সংক্রমণের ভয়?
না, সব ক্ষেত্রে নয়। ব্যাকটেরিয়া সাধারণত ত্বকে ক্ষত থাকলে তা ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে। পায়ে বা শরীরে ছোট কাটা-ছেঁড়া, ফোসকা, চামড়া ফেটে যাওয়া বা আঁচড় থাকলে সেই পথেই জীবাণু শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। এছাড়া চোখ, নাক ও মুখ দিয়েও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
জমা জলে লেপ্টোস্পাইরোসিসের ঝুঁকি! ছবি: সংগৃহীত
প্রচলিত ভুল ধারণা
মিথ: জমা জল স্পর্শ করলেই লেপ্টোস্পাইরোসিস হবে।
সত্য: না। সংক্রমণের জন্য দূষিত জল এবং শরীরে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের পথ, দুটোই থাকতে হয়।
মিথ: দেখতে পরিষ্কার জল নিরাপদ।
সত্য: একেবারেই নয়। পরিষ্কার দেখালেও সেই জলে ব্যাকটেরিয়া, নর্দমার ময়লা বা প্রাণীর বর্জ্য থাকতে পারে।
মিথ: শুধু নর্দমার জল থেকেই এই রোগ ছড়ায়।
সত্য: বন্যার জল, কাদা, ভেজা মাটি বা সংক্রমিত প্রাণীর প্রস্রাবে দূষিত যে কোনও স্থান থেকেই সংক্রমণ হতে পারে।
কীভাবে বাঁচবেন?
- জল জমা এলাকায় হাঁটতে হলে জলরোধী জুতো বা গামবুট পরুন।
- কাটা-ছেঁড়া বা ফোসকা থাকলে জলরোধী ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
- খালি পায়ে কখনও জল মাড়াবেন না।
- বাড়ি ফিরে সাবান ও পরিষ্কার জল দিয়ে পা এবং শরীরের খোলা অংশ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
- ভেজা জামাকাপড় ও জুতো দ্রুত বদলে শুকনো পোশাক পরুন।
জল মাড়িয়ে কোনও শারীরিক সমস্যাকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
সংক্রমণের ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শুরুতে অনেকটা ভাইরাল জ্বরের মতো মনে হলেও অবহেলা করা উচিত নয়। প্রধান লক্ষণগুলির হল-
- জ্বর
- বিশেষ করে পায়ের পেশিতে তীব্র ব্যথা
- মাথাব্যথা
- কাঁপুনি
- বমি
- অতিরিক্ত দুর্বলতা
গুরুতর অবস্থায় চোখ লাল হয়ে যাওয়া, জন্ডিস, পেটে ব্যথা, কিডনি বা লিভারের জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
বর্ষার জল মাড়ানোর কয়েক দিনের মধ্যে জ্বর, শরীরব্যথা বা উপরের কোনও উপসর্গ দেখা দিলে দেরি করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং চিকিৎসককে অবশ্যই জানান যে সম্প্রতি আপনি জমা জলের সংস্পর্শে এসেছেন কিনা। দ্রুত রোগ ধরা পড়লে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব এবং গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিও অনেকটাই কমে।
