shono
Advertisement

অবসরের পর আর্থিক নিশ্চয়তা চান, অবশ্যই জেনে রাখুন এই তথ্যগুলি

‘রিটায়ার’ করে পেনশন পান না এমন প্রাইভেট সেক্টরের প্রাক্তন কর্মীর সংখ্যা অগণিত।
Posted: 02:59 PM Mar 02, 2022Updated: 02:59 PM Mar 02, 2022

‘রিটায়ার’ করে পেনশন পান না এমন প্রাইভেট সেক্টরের প্রাক্তন কর্মীর সংখ্যা অগণিত। বহু ধরনের কর্মস্থলে পরিকল্পিত পেনশনের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাবেন না। এদিকে, জীবনযাত্রার খরচাপাতি বেড়ে যাচ্ছে অপ্রতিহত বেগে, সাধারণ সংসারী ট্যাক্সপেয়ার-ই তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ তো কোন ছাড়! লিখছেন নীলাঞ্জন দে

Advertisement

 

ভারতে যে ‘সেভিংস রেট’ যথেষ্ট উঁচু, এবং ঐতিহাসিকভাবেই তাই, এ তো জানা কথা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, অনেক পরিশ্রম করে, টাকা বাঁচিয়েছেন সাধারণ মানুষ। যেখানে প্রধানত ‘প্রতিশ্রুত রিটার্ন’ পাওয়া যায়, সেখানে কম-ঝুঁকির লগ্নি করেছেন (স্টক মার্কেটের এই রমরমা তো গত কয়েক দশকের ট্রেন্ড মাত্র), আর দিনের শেষে মুদ্রাস্ফীতির হার তথা প্রদেয় আয়করের হিসাব ছাপিয়ে সামান্য লাভও যদি পেয়ে থাকেন, তা নিয়েই আহ্লাদিত হয়েছেন।

এত সেভিংস সত্ত্বেও অনেকেই মন দেননি নিজের পেনশনের প্রতি, তাই বাঁচিয়ে রাখা মোট সম্পদের বৃহদংশ বয়সকালে তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। কথাটি কিঞ্চিৎ রূঢ় শোনালেও তাঁদের তহবিল গঠনের উদ্দেশ্য খানিকটা জলেই গিয়েছে বলা যায়। অবসরোত্তর জীবন কষ্ট করে কাটবে জেনেও এবং যথাযোগ্য পেনশনের অভাবে লাইফস্টাইল বদলাতে হবে বুঝেও, রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং করে উঠতে পারেননি আমাদের অগণিত সহ-নাগরিক।

নাতিদীর্ঘ লেকচারের এত অবধি শুনে হাত নেড়ে থামতে বললেন আমার প্রতিবেশী। বয়সে নবীন, কিন্তু ব্যবহারে গুরুগম্ভীর, কখনওই পাণ্ডিত্য ফলান না, তবে পরিস্থিতি বুঝে মাঝে মাঝে খুব সিরিয়াস ধরনের কথা বলেন। ‘এত কিছু শোনালেন কিন্তু আসল কথাটা জানালেন না- পলিসি স্তরে নতুন চিন্তাভাবনা দরকার, না হলে ইউনিভার্সাল পেনশন থেকে আমরা শতহস্ত দূরেই থেকে যাব, সবাইকে সোশ্যাল সিকিউরিটির অন্তর্গত করতে পারব না।’

[আরও পড়ুন: জীবন বিমার দুনিয়ায় আপনার জন্য আদর্শ কোন পলিসি, তা বুঝবেন কীভাবে?]

ঠিকই। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের মতো আমাদেরও পেনশনের যথাযোগ্য পরিকাঠামো ছিল না দীর্ঘদিন। যে-ব্যবস্থাটি চলত, তা ছিল একপেশে। পেনশন রেগুলেটর আসার পর সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে বটে, তবে এখনও অসংখ্য ভারতবাসী অবসরের জন্য ভালভাবে তৈরি নন। ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি’ যে অপ্রতুল তা প্রত্যেকেই বোঝেন, সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে পাঁচতারায় সেমিনারের অভাবও কোনও দিন হয়নি, কিন্তু এই বিরাট গণতান্ত্রিক দেশের কোনও ‘স্তম্ভ’-ই এ ব্যাপারে তেমনভাবে সোচ্চার হয়নি।

ছুটির দিনের বিকেলবেলায় আমাদের আলোচনা শুরু হয়েছিল রিটায়ারমেন্ট নিয়ে চায়ের টেবিলে। নেপথ্যে ছিল যে-প্রসঙ্গটি তা নিয়ে পৃথিবীসুদ্ধ লোক এখন সজাগ: ইনফ্লেশন। মূল্যবৃদ্ধির করাল গ্রাসে পড়েছে খাদ্যদ্রব্য, জ্বালানি, চিকিৎসা ক্ষেত্র। নানা কমোডিটি-ভিত্তিক ব্যবসাবাণিজ্যে দাম বাড়া এখন প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিশ্চয়ই অবস্থা আরও ঘোরালো হবে, বোঝাই যাচ্ছে। ‌এই পরিস্থিতিতে আলাদাভাবে অবসরকালীন ব্যবহারের জন্য ‘কর্পাস’ তৈরি করা অতীব কঠিন কাজ, নিঃসন্দেহে এর জন্য প্রচুর ত্যাগ ও পরিশ্রম দরকার।

‘আরও একটা জিনিস লক্ষ করবেন, ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (Universal Basic Income, UBI) নিয়ে আমরা যা মাতামাতি করি, তার অর্ধেকও যদি আমরা ইউনিভার্সাল পেনশন নিয়ে করতাম, তাহলে মানুষকে আরও ভাবিয়ে তোলানো যেত, হয়তো আমাদের পলিসি-মেকাররা যৎকিঞ্চিৎ বেশি উদ্বুদ্ধ হতেন’- আমার পরিচিত মানুষটি ব্যাখ্যা করলেন। ব্যাখ্যাটি মনে ধরল। একই সঙ্গে ভাবলাম এবার আমার ‘পেট থিওরি’- একান্ত নিজস্ব দর্শনটি- ওঁকে একটু শুনিয়ে রাখি। তাই ‘ডোনেট আ পেনশন’ (Donate a pension) নিয়ে সামান্য দু’-চার কথা বললাম। আমার মতে স্বাতন্ত্র্যের নিরিখে এটি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

এ নিয়ে অবশ্য প্রাথমিক চিন্তা লেবার মিনিস্ট্রি ইতিমধ্যে করেছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। আসলে, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে অর্থনৈতিক অসাম্য এত প্রকট, সার্বিক নিশ্চয়তা, বিশেষ করে অসংগঠিত কর্মক্ষেত্রের পেনশন, নিঃসন্দেহে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের দৌলতে, নানা ধরনের প্রান্তিক কর্মীকে পেনশনের আওতায় আনতে পারলেও অর্থনীতির এক বিপুল অংশে তা অধরাই রয়ে গিয়েছে।

তাই ওই পরিপ্রেক্ষিতে ‘ডোনেট আ পেনশন’, যার ভিত্তিতে সাধারণ নাগরিক উপকৃত হবেন, একটি উদ্ভাবন বটে। তুলনায় বিত্তবান মানুষ স্বপ্রবৃত্ত হয়ে যদি অসংগঠিত কর্মীর পেনশন ‘সাবসিডাইজড’ করেন, তাহলে এটি সফল হবে। ব্যাপারটা কিছুটা রান্নার গ্যাসের সাবসিডি নিজে থেকে ছেড়ে দেওয়ার মতো, যাতে অপেক্ষাকৃত কম ভাগ্যবান মানুষ সুযোগ পান। পরিকল্পনাটি সার্থক হতে পারে যদি একক কোনও ব্যক্তি কর্মী-পিছু এককালীন ৩৬,০০০ হাজার টাকা ডোনেট করেন। যে প্রকল্পের মাধ্যমে তা করতে হবে তার পোশাকি নাম ‘প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মান-ধন’ (PM-SYM); এর অন্তর্গত প্রান্তিক কর্মীরা মাসে ৩,০০০ টাকা পেনশন হিসেবে পান ৬০ বছর বয়স পার করলে। এখানে ৫০% কন্ট্রিবিউশন নিজে দিতে হয়, বাকিটা আসে সরকারের তহবিল থেকে।

এই প্রসঙ্গে পেনশন নিয়ে একটি বহুচর্চিত কথা উত্থাপন করি। ‘রিটায়ার’ করে পেনশন পান না এমন প্রাইভেট সেক্টরের প্রাক্তন কর্মীদের সংখ্যা অগণিত। বহু ধরনের কর্মস্থলে পরিকল্পিত পেনশনের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাবেন না। রিটায়ারমেন্টের পর যখন রোজগার বন্ধ হয় তখন কী অবস্থায় তাঁদের একাংশ থাকেন তা সহজেই অনুমেয়। আমরা সবাই জানি, জীবনযাত্রার খরচাপাতি বেড়ে যাচ্ছে অপ্রতিহত বেগে, সাধারণ রোজগেরে ও সংসারী ট্যাক্সপেয়ার-ই তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ তো কোন ছাড়! এদিকে, জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ প্রবীণতর হয়ে উঠছে, ‘অ্যাভারেজ লাইফস্প্যান’ (Average lifespan) বাড়ছে। এছাড়া, আমাদের দেশে ‘ফার্টিলিটি রেট’ (Fertility rate) কমছে, যা সর্বশেষ ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে’-এর দৌলতে স্পষ্টভাবে জানা গিয়েছে। হ্যাঁ, ভারতের ডেমোগ্রাফিক চরিত্র এবার তাহলে একটু হলেও বদলাচ্ছে।

এ ব্যাপারে আর বেশি কিছু না বলে শুধু জানাই, PM-SYM সেই তাঁদেরই উদ্দেশে গঠিত যারা মিড-ডে মিল কর্মী, রিকশাচালক, ইটভাটা শ্রমিক, চামড়া শিল্পে কর্মরত মানুষ এবং অন্যান্য নানা শ্রেণির অসংগঠিত লেবার। এঁদের মাসিক রোজগার ১৫,০০০ টাকার কম হতে হবে এবং বয়স হওয়া দরকার ১৮ থেকে ৪০ এর মধ্যে- সরকারি ভাবনা অনুযায়ী। প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ‘এমপ্লয়িজ স্টেট ইনশিওরেন্স কর্পোরেশন’-এর আওতায় নেই, এমন শর্তও দেওয়া আছে। একক ব্যক্তি যা কন্ট্রিবিউট করবেন, তার সমপরিমাণ অর্থ সরকারের দেবে।

ব্যাপারটি আরও ভালভাবে বোঝা যাবে নিচের ছবিটি দেখলে। সুবিধার জন্য কেবল একটি বয়সই বেছে নিয়েছি ১৮ বছর, অর্থাৎ ‘এন্ট্রি এজ’ যাকে বলা যায়। উপরে একটি আদর্শ চিত্র তুলে ধরা হল। বলা বাহুল্য, যে-কর্মী যত আগে শুরু করতে পারবেন, তাঁর ততই সুবিধা। তাহলে মিনিমাম পেনশন পাওয়ার জন্য তুলনায় অল্প টাকা দিতে হবে। ঘটনা হল, দেশের বৃহত্তম বিমা কোম্পানি ‘এলআইসি’ এই প্রকল্পের ফান্ড ম্যানেজার। আর হ্যাঁ, গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।

এতক্ষণ হল, নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের কথা। এবার ভনিতা ছেড়ে বলে রাখি যে, এই জাতীয় পরিকল্পনার মূলে আছে ‘ডিফাইনড বেনিফিট’ (Defined Benefit, DB) নামক পুরনো আমলের সূত্রটি। সংক্ষেপে, কর্মজীবনের শেষে রিটায়ার করে কী পাবেন তা মোটামুটি জানাই থাকবে। সেখানে মার্কেট-নির্ভরতা কম। পুরনো, কারণ DB থেকে আমরা ইতিমধ্যে খানিকটা সরে এসেছি, ‘নিউ পেনশন সিস্টেম’ (NPS) ব্যবহারকারীরা এর ঠিক উলটো রাস্তায় হাঁটছেন। তাঁদের নজরে আজ ‘ডিফাইনড কন্ট্রিবিউশন’ (Defined Contribution, DC)। মানে, আপনি একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী অবসরের কথা ভেবে নিজের মতো করে সম্পদ জমিয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে ফলাফল অনেকটাই মার্কেটভিত্তিক। পেনশন ক্ষেত্রে রিফর্ম এনে এখন অনেক দেশেই ডিফাইনড কন্ট্রিবিউশনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ডিফাইনড কন্ট্রিবিউশনের ব্যাপারে এই মুহূর্তে বেশি উৎসাহী।

এবার মনে করুন- আপনার বয়স ১৮, প্রতি মাসে ৫৫ টাকা কন্ট্রিবিউশন হিসাবে দিচ্ছেন এবং পরের অনেকগুলি বছর ধরে তাই দিয়ে যাবেন, যতদিন না ষাটে উপনীত হচ্ছেন। কারণ তাহলেই মাসে অন্তত ৩,০০০ টাকার পেনশন পাবেন। তাতে আপত্তি নেই, তবে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ যদি মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ধরেন, তাহলে ততদিনে পেনশনের অঙ্কটি আদতে কী সুবিধা করে দেবে তা ভেবে দেখবেন। আমার হিসাব অনুযায়ী, সামান্য কয়েকশো টাকার সমানে এসে দাঁড়াবে তা।

‘তাহলে আমাদের কি করণীয়?’ বললাম, ইনফ্লেশনকে মান্যতা না দিলে চলবে না, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এবং সেজন্য ইন্ডেক্স-লিঙ্কড রিটায়ারমেন্ট সংক্রান্ত নিয়মকানুন নির্দিষ্ট স্তরে চালু করতে হবে। এখনকার দিনে একজন অল্পবয়সি যুবক বা যুবতী যখন মধ্যবয়স্ক হবেন, আরও পরে অবসর নেবেন, তখন ইনডেক্স-লিঙ্কড পেনশন তাঁকে সঠিকভাবে সাহায্য করবে। নতুবা, একটি সুন্দর পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে, একটি সদিচ্ছা পূর্ণতা পাবে না। এবার তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ততক্ষণে আমাদের চা-পান পর্বও সমাপ্ত।

[আরও পড়ুন: এলআইসি আইপিওতে লগ্নি করবেন? নজর রাখুন এই বিষয়গুলিতে]

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

Advertisement