টানা ৭২ ঘন্টা ধরে ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার জঙ্গলে 'মেঘাবুরু' অভিযানে ১৭ জন মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। সেইসঙ্গে নিহত মাওবাদীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও। কিন্তু এত বড় অভিযানেও হাত ফসকে বেরিয়ে গেল সিপিআই (মাওবাদী) পলিটব্যুরো সদস্য মিসির বেসরা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ।তিনি গুলিবিদ্ধ কিনা, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারেনি ওই অভিযানে শামিল হওয়া ঝাড়খণ্ডের যৌথবাহিনী।
শনিবার বিকালে ঝাড়খণ্ড পুলিশ প্রেস বিবৃতি দিয়ে ওই অভিযানে ১৭ জন নিহত মাওবাদীর খবর জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ১৬ জনের মৃতদেহ মিলেছিল। শুক্রবার রাতে আরেকজনের মৃতদেহ মেলে। রাত পর্যন্ত যাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি, এদিন পুলিশের ওই বিবৃতিতে তাদের পরিচয়ও জানানো হয়েছে। ২৬ জানুয়ারি, দেশের সাধারণতন্ত্র দিবস থেকেই ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী দমনে আরও বড়সড় অভিযান শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মাওবাদী দমন অভিযান। ফাইল ছবি
সিপিআই (মাওবাদী) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশের দেহরক্ষী পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার রঞ্ঝা গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গল মাহাতোর মৃত্যু হয়নি। ঝাড়খণ্ড পুলিশ শুক্রবারই তা জানিয়েছিল। শনিবার তাদের প্রেস বিবৃতিতে মৃতের তালিকায়ও তার নাম নেই। সাধারণতন্ত্র দিবসের আগে সারান্ডার জঙ্গলে নাশকতা ঘটানোর ব্লু প্রিন্টের বৈঠকে সিপিআই(মাওবাদী)-র পলিটব্যুরোর সদস্য মিসির বেসরা ও আকাশ ছিলেন। তারা বাহিনীর হাত ফসকে বেরিয়ে গিয়েছেন বলেই খবর। ঝাড়খণ্ড পুলিশের প্রেস বিবৃতিতে এই বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
'মেঘাবুরু' অভিযানে নিহত রাজ্যের দক্ষিণ বাঁকুড়ার বারিকূল থানার ইন্দকুড়ির বাসিন্দা নিহত সুরেন্দ্রনাথ সরেন ওরফে সমীর ছাড়াও বেশ কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। তালিকায় রয়েছে নিহত সিপিআই (মাওবাদী) স্কোয়াড সদস্য রাপা মুন্ডা ওরফে পাবেল, তার বাড়ি ওড়িশার সুন্দরগড় জেলার টোটকোই থানার কেবলাঙ্গে। তিনি স্পেশাল জোনাল কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া চার মাও ক্যাডার - সোমবারি পূর্তি, সোমা হোনহাগা, মুক্তি হোনহাগা ও সরিতা। সোমবারির বাড়ি ঝাড়খণ্ডের চাইবাসা জেলার গোয়েলকেরা থানার কসিজাউয়ে। বাকি তিন ক্যাডারের বাড়ি জানাতে পারেনি ঝাড়খণ্ড পুলিশ। এই তিনদিনের অপারেশনে নিহত মাওবাদীদের কাছ থেকে চারটি করে একে ৪৭ ও ইনসাস, তিনটি করে এসএলআর ও থ্রি নট থ্রি রাইফেল-সহ প্রচুর গুলি উদ্ধার হয়।
এদিন সকালে অভিযানস্থল থেকে মৃতদেহগুলি উদ্ধার করে ঝাড়খণ্ডের যৌথবাহিনী। টানা গুলির লড়াই চলায় ঘন জঙ্গলেই পড়েছিল মৃতদেহগুলি। ঝাড়খণ্ড পুলিশের ডিজি তাদাশা মিশ্র জানান, "তিনদিনের অপারেশন 'মেঘাবুরু' শেষে ১৭ জন সিপিআই (মাওবাদী) নেতানেত্রীর মৃতদেহ মিলেছে। তারা ঝাড়খণ্ড ছাড়াও বাংলা, ওড়িশার গেরিলা। এই অভিযানে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মিলেছে। একসঙ্গে ১৭ জন মাওবাদী নেতানেত্রী খতম হওয়ায় সিপিআই (মাওবাদী)-র কাছে এটা বড় ধাক্কা। অপারেশন 'মেঘাবুরু' শেষ হলেও মাওবাদী দমনে ধারাবাহিক অভিযান চলবে।"
ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রশস্ত্র। নিজস্ব ছবি
ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার সারান্ডার জঙ্গলে কিরিবুরু থানার কুমডি এলাকায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অপারেশন শনিবার সকালে শেষ হয়। এই টানা অপারেশনের মধ্যেই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে ঝাড়খণ্ডের যৌথ বাহিনীকে বাহবা জানান। লেখেন, "২০২৬ সালের ৩১ মার্চের আগে দেশে নকশালবাদ সমাপ্ত করার সংকল্প রয়েছে। যে সকল নকশালরা এখনও রয়েছে, তাদের আবেদন, আতঙ্ক আর অস্ত্রের বিচারধারা ছেড়ে উন্নয়ন ও বিশ্বাসের মুখ্যধারার পথে আসুন।"
মাওবাদী দমনের সাফল্যে এক্স হ্যান্ডল পোস্ট অমিত শাহর।
এদিকে, নিহত মাওবাদীদের মৃতদেহের পর ময়নাতদন্ত হয়ে গেলেও এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহত সুরেন্দ্রনাথের পরিবারকে ঝাড়খণ্ড পুলিশ কোনও কিছু জানায়নি। বারিকুল থানা থেকেও তারা কোনও খবর পাননি। তার ভাই হলধর মাহাতো বলেন, "শুনেছি জঙ্গল থেকে দাদার মৃতদেহ উদ্ধার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমাদেরকে কিছু জানানো হয়নি। দাদা জঙ্গলে চলে যাবার পর অনেক ছোটবেলায় একবার বাড়ি এসেছিল। তখন আমার ১৪- ১৫ বছর বয়স হবে। তখন আমি এসব কিছু বুঝতাম না। না হলে বলতাম, দাদা বাড়ি ফিরে আয়।"
