রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গান্ধারীর আবেদন' কবিতার প্রবাদপ্রতিম পংক্তি---“দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে...” আসলে মানবিক বিচারবোধের প্রতীক। প্রতিদিন তথ্য ও যুক্তির কঠিন ভার বওয়া বিচারপতিরাও তো মানুষ! বুধবার ১৩ বছর কোমায় আচ্ছন্ন হরিশ রানার নিষ্কৃতিমৃ্ত্যুর রায়দানের সময় সেকথাই প্রমাণিত হল সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে। ঐতিহাসিক রায় দিতে গিয়ে চোখের জলে ভাসলেন বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা। বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হল ভারতের বিচারব্যবস্থা।
হরিশ রানা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়েরই পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছিলেন। এর পর থেকেই তিনি কোমাতে রয়েছেন। চিকিৎসকদের সমস্ত রিপোর্ট বিস্তারিত পরীক্ষা করার পরেই আদালত হরিশের ‘লাইফ সাপোর্ট’ খুলে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। চিকিৎসকেরা আগেই জানিয়েছিলেন, হরিশের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তার পরে ওই যুবকের অভিভাবকেরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার সময় হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রশংসা করেছে। বেঞ্চের মন্তব্য, ‘‘দীর্ঘ ১৩ বছর তাঁরা পুত্রের পাশ থেকে সরেননি। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি- দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবার ও সকল চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন হরিশের জন্য মঙ্গলের।’’
রায় দেওয়ার সময় বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা বলেন, ‘‘হরিশ রানা পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলের পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে গুরুতর চোট পান। কিন্তু তার পর থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। অচৈতন্য অবস্থার মধ্যে দিয়ে তাঁকে কাটাতে হয়েছে। অন্যের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ১৩ বছর ধরে চিকিৎসাতেও শারীরিক কোনও উন্নতি হয়নি।’’ এই পরিস্থিতিতে পরিবারের দাবি অনুযায়ী, এবং চিকিৎসকদের মতামত নিয়ে তাঁর নিষ্কৃতিমৃত্যুর রায় দেওয়া হচ্ছে। এর পরেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি। চোখ জলে ভরে ওঠে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালার।
এদিন নিষ্কৃতিমৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার সময় আবেগঘন বক্তব্যে দুই বিচারপতির বেঞ্চ বলে, একজন মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার আছে? এই প্রশ্ন মনে পড়ে মার্কিন মন্ত্রী হেনরি ওয়ার্ড বিচারের বিখ্যাত উক্তি—মানুষ জীবন চায় কিনা ঈশ্বর জানতে চায় না। বাধ্যতামূলক গ্রহণ করতে হয়। হরিশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর রায় দিতে গিয়ে বিচারপতির বেঞ্চ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর প্রসিদ্ধ ‘টু বি অর নট টু বি’ লাইনটিও উল্লেখ করে।
প্রসঙ্গত, ‘ইউথেনেশিয়া’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘ইউ’ এবং ‘থানাতোস’ থেকে এসেছে। ‘ইউ’ শব্দটির অর্থ সহজ এবং ‘থানাতোস’ কথাটির মানে মৃত্যু। অর্থাৎ ‘ইউথেনেশিয়া’ শব্দটির মানে দাঁড়াচ্ছে ‘সহজ মৃত্যু’। নেদারল্যান্ড, কানাডা, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ডে ইউথেনশিয়াকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কেবল মৃত্যুযন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া মানুষই নয়, যাঁরা কোমায় রয়েছেন বছরের পর বছর ধরে, তাঁদেরও মৃত্যুর জন্য আবেদন করেন তাঁদের স্বজনরা।
