হুডখোলা জিপে তিনি। পরনে প্রথাগত সাদা মুন্ডু ও হাফশার্ট। মাথায় নীল গান্ধী টুপি। তার একপাশে লেখা আম আদমি পার্টি ও আরেক দিকে দলের প্রতীক ঝাঁটা। তাঁকে ঘিরে জনাকয়েক যুবক।
এখানে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দিনের আলো থাকে। তারপর ঝুপ করে অন্ধকার নেমে যায়। সেই অন্ধকার নামার কিছু আগে জিপ এসে দাঁড়াল কাটুর বাস স্ট্যান্ডে। ২৭ বছর আগে নিজের সাংসদ তহবিল থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা ব্যয় করে এই বাসস্ট্যান্ড বানিয়ে দিয়েছিলেন কে করুণাকরণ, পরে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন যিনি। বাসস্ট্যান্ডের দেওয়ালে তাঁর কীর্তি আবছা হয় না কখনও, বারবার লিখে দেওয়া হয়। জিপ দাঁড়াতেই তার মধ্যমণি সওয়ার হাতজোড় করে হাসিমুখে চতুর্দিকে চোখ ফেরাতে থাকলেন। কিন্তু, স্ট্যান্ডে বাড়ি ফেরার বাসের অপেক্ষায় থাকা লোকজনের তাঁকে নিয়ে বিশেষ হেলদোল নেই। জনা তিনেক যুবক রঙিন লিফলেট বিলি করছিল, একটি আমার হাতেও এল। মালয়ালম ভাষায় লেখা লিফলেট। একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, মধ্যমণি হলেন ডা. সাজু কে ওয়াই। ইরিনজালাকুডা বিধানসভা কেন্দ্রে আম আদমি পার্টির প্রার্থী।
পরিচয় দেওয়াতে একটু উৎসাহ পেয়ে জিপ থেকে নেমে এলেন প্রার্থী। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগে নিজেই মালওয়ালি ভাষায় অনেক কথা বলতে শুরু করলেন। আমি বুঝতে পারছি না, বুঝে এবার ইংরেজিতে বললেন, কেরলে দীর্ঘদিন ধরে এলডিএফ ও ইউডিএফ পালা করে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাই তারা ভোটারদের কাছে 'তৃতীয় বিকল্প' হিসাবে নিজেদের তুলে ধরছেন।
২০১৬ ও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আপ-এর উপস্থিতি ছিল সীমিত। সংগঠনও তেমন শক্তিশালী ছিল না। তবে গত কয়েক বছরে তারা কেরলে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। বিশেষত শহরাঞ্চল, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে 'বিকল্প রাজনীতি'-র বার্তা পৌঁছে দিতে সক্রিয় হয়েছে তারা। এবার ২২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আপ।
ইরিনজালাকুডা আধা-গ্রাম, আধা শহর। পরিকল্পিত আবাসস্থল। প্রতিটি বাড়িই প্রাসাদোপম। সুন্দর। বাড়ির সঙ্গে বিরাট বাগান। উপসাগরীয় দেশে কর্মরত বহু মানুষের পরিবার এখানে বাস করে, ফলে 'গালফ মানি'-র প্রভাব রয়েছে। বলা যায়, গালফ থেকে আসা রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকা শক্তি।
এলডিএফ বলছে, গত কয়েক বছরে কেরলে পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আবার এলডিএফ সরকার দরকার। ইউডিএফ চেষ্টা করছে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কাজে লাগাতে। ইউডিএফ এই কেন্দ্রে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী।
এখানে সিপিএম-এর প্রার্থী রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আর বিন্দু। ২০২১ সালে ইরিনজালাকুডা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে প্রথমবার বিধায়ক হন এবং সেই সঙ্গে ত্রিশূর জেলার প্রথম মহিলা মন্ত্রী হিসাবেও ইতিহাস গড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা চ্যালেঞ্জের? আপ প্রার্থী বলছেন, "আমরা নিজেদের 'কিংমেকার' নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে 'বিকল্প শক্তি' হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি।"
তবে মূল লড়াই এখনও এলডিএফ বনাম ইউডিএফ-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এলডিএফ বলছে, গত কয়েক বছরে কেরলে পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আবার এলডিএফ সরকার দরকার। ইউডিএফ চেষ্টা করছে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কাজে লাগাতে। ইউডিএফ এই কেন্দ্রে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন এই জোটের ভোটব্যাঙ্ক মূলত খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় অংশ ও শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ভোটার। আর তৃতীয় শক্তি, এনডিএ নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়ে ভবিষ্যতের জন্য ভিত্তি তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনডিএ নির্দিষ্ট কিছু ভোট কেটে সমীকরণ বদলাতে পারে।
