শুল্কযুদ্ধ ও মার্কিন আগ্রাসনের মাঝেই ট্রাম্পের নাকের ডগায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করল ভারত (India-EU Trade Deal)। মঙ্গলবার সকালে ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তনিও কোস্টা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভনের উপস্থিতিতে এই চুক্তি সই করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। চুক্তি সই হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এক বিরাট চুক্তি সই হয়েছে। যাকে বিশ্ব মাদার অফ অল ডিলস বলে উল্লেখ করেছে।' এদিকে কূটনৈতিক মহলের দাবি, ভারত ও ইউরোপের এই চুক্তিতে কার্যত একঘরে হতে চলেছে আমেরিকা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই চুক্তি সই হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, "ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এক বিরাট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যাকে বিশ্ব মাদার অফ অল ডিলস বলে উল্লেখ করেছে। এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের নাগরিকদের জন্য এক বিরাট সুযোগ তৈরি করবে। এই চুক্তি বিশ্বের প্রধান দুই অর্থনীতির মধ্যে অংশীদারিত্বের এক অনন্য উদাহরণ। আমাদের এই চুক্তি গোটা বিশ্বের মোট ডিজিপির ২৫ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করবে।'' এমনিতেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য সহযোগী। রিপোর্ট বলছে, ২০২৩-২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হয়েছে ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের। অনুমান করা হচ্ছে, নয়া এই চুক্তি মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যে আরও জোয়ার আনবে।
দেশের বাজারে সস্তা হবে বিদেশি ওয়াইন। যদিও এই চুক্তির মধ্যে ভারতের দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং কৃষিক্ষেত্রকে রাখা হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে। তবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, শক্তিসম্পদ, ওষুধের মতো ক্ষেত্রগুলিকে চুক্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে খবর।
চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর ইউরোপের নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী। ছবি: পিটিআই।
২০০৭ থেকে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে। দীর্ঘ ১৮ বছরের চেষ্টার পর অবশেষে মঙ্গলবার বাস্তবায়িত হয়েছে ঐতিহাসিক এই চুক্তি। যাকে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ আখ্যা দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট ২৭টি দেশ রয়েছে। ২৭টি দেশের এই জোটের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতায় ঠিক কোন কোন বিষয় রয়েছে, তা এখনও সরকারিভাবে জানানো হয়নি। তবে সূত্রের খবর, যে গাড়িগুলির আমদানিমূল্য ১৫ হাজার ইউরো (ভারতীয় মুদ্রায় ১৬ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা)-র বেশি, সেই সমস্ত গাড়িগুলির উপর শুল্ক হ্রাস হতে চলেছে। সেক্ষেত্রে দেশের বাজারে সস্তা হবে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেনজ-এর মতো ইউরোপীয় সংস্থার গাড়িগুলি। উল্লেখ্য, বর্তমানে ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত গাড়ির উপর ১১০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। সূত্রের খবর, চুক্তির পর এই শুল্ক কমে ৪০ শতাংশের আশপাশে নেমে আসতে পারে। শুধু তা-ই নয়, ভারত-ইউরোপ বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন হলে বিদেশি ওয়াইনের উপরও শুল্ক কমানো হবে। ফলে দেশের বাজারে সস্তা হবে বিদেশি ওয়াইন। যদিও এই চুক্তির মধ্যে ভারতের দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং কৃষিক্ষেত্রকে রাখা হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে। তবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, শক্তিসম্পদ, ওষুধের মতো ক্ষেত্রগুলিকে চুক্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে খবর। চুক্তি সই হলেও তা পুরদমে বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে বলে জানা যাচ্ছে। আনুমানিক ২০২৭ সাল থেকে শুরু হয়ে ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য।
চুক্তি স্বাক্ষরের প্রাক্কালে ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তনিও কোস্টা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী। ছবি: পিটিআই।
প্রসঙ্গত, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়া এবং তারপর বিরাট শুল্কবাণ আছড়ে পড়া-দুইয়ে মিলে বেশ ধাক্কা খেয়েছে ভারতের বাজার। সেই লোকসান সামাল দিতে বিকল্প বাজারের সন্ধান করছে ভারত। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও ইউরোপের একাধিক দেশের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন ইউরোপীয় নেতৃত্ব। এই ডামাডোলের মাঝে ভারত ইউরোপের এই ঘনিষ্ঠতা ট্রাম্পকে 'একঘরে' করল বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
