রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়: গলার শিরা-উপশিরা সমস্ত দপদপ করছে। পরিত্রাহী চিৎকারে এবার ফেটেই যাবে বোধহয়! চোখ বিস্ফারিত। দৃষ্টি জান্তব। গ্রীবা সেই যে উন্মুক্ত হয়েছে, কিছুতেই আর বন্ধ হওয়ার নামগন্ধ নেই। কী করে সম্ভব? কী করে হবে? বিভূতি গ্রহণের সময় হল যে! বিগ্রহের আগমন ঘটেছে, এখুনি প্রবেশ করবেন তিনি মন্দিরে, উপাসনায় বসতে হবে, প্রার্থনা করে যেতে হবে একটানা। সমগ্র ভারতবর্ষ ইদানিং তাঁকে দেখলে করে যেমন। যা আসমুদ্রহিমাচলের ক্রিকেট পূজারিদের কাছে অধুনা গায়ত্রী মন্ত্র, আজান কিংবা ‘সামস’!

‘বিরাট...বিরাট...বিরাট...বিরাট!’
ইডেনে সেই দৃশ্য দেখতে-দেখতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল রীতিমতো। নাহ্, অসামান্য কিছু সম্মোহনী মুহূর্ত সৃষ্টি করতে এ শহর পারে বটে! আর তা সে ফি বছরই করে। মহেন্দ্র সিং ধোনি এলে। রোহিত শর্মা এলে। বিরাট কোহলি এলে। আইপিএলের সময় প্রতি বছর এ শহর বুঝিয়ে দেয়, তার কাছে জাতীয় বীর আগে। সর্বাগ্রে এ দেশের ক্রিকেট সন্তানকুল। প্রথমে তার মর্যাদা প্রদান, তার পর ঘরের টিমের প্রতি মায়া-মমতা-ভালোবাসা। আগামী শনিবার দুই প্রবল জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির মহা-সমর। খেলার রেজাল্ট যা-ই হোক। কিন্তু আবেগের রেজাল্ট আজই লিখে দেওয়া যায়–কোহলি ষাট, কেকেআর চল্লিশ!
ইডেনে সোনালি-বেগুনি ছাউনি ফেলে প্রতিনিয়ত কসরৎ করছে, নিদেনপক্ষে দিন দশ হয়ে গেল। কিন্তু কেকেআর মাঠে প্র্যাকটিস করার সময় ‘সুপার ফ্যান’ অশোক চক্রবর্তীর শঙ্খধ্বনি আর জনা কয়েক সোনালি-বেগুনি সমর্থকের ছুটকো চিৎকার ছাড়া এ যাবৎ ইডেন গ্যালারি থেকে বিশেষ কিছু শোনা যায়নি। এ দিন সেখানে নেটে কোহলির ব্যাটিংয়ের সময় অন্তত শ’দেড়েক লোকের জমায়েত হয়ে গেল! তাঁরা কোথা থেকে এলেন, কী ভাবে নিরাপত্তার রক্তচক্ষুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গলে গেলেন, কেউ জানে না। অবিস্মরণীয় দৃশ্যপটও জন্ম নিল কতিপয়। বিরাটদের মাঠ ছাড়ার আগে বারবার ‘ডামি’ বাস এসে হাজির হচ্ছিল সিএবিতে। যাতে লোকের মনে হয়, তিনি মাঠ ছেড়ে় বেরিয়ে গিয়েছেন! মাঠেও তো। নেটে এক-একটা শট মারছিলেন বিরাট-রাজা, আর নেপথ্যে উল্লাসে ফেটে পড়ছিল তাঁর ‘সেনাবাহিনী’!
অথচ ঠিক পাশে তখন ট্রেনিং করছে কেকেআর। সুনীল নারিন বোলিং করছেন। বরুণ চক্রবর্তী স্পিন বোলিং নামক রহস্য-রোমাঞ্চের আস্ত উপন্যাস লিখছেন। কিন্তু সে সব দেখবে কে? খেয়াল রাখবে কে? দু’দলের ট্রেনিং দেখতে উপস্থিত ক্রিকেটপ্রেমীকুল, ক্রিকেট মিডিয়া, ক্রিকেট প্রশাসক–সবাই যে তখন বিরাট কোহলি নামক ‘তানসেনে’র সুর-মূর্ছনায় শ্রবণেন্দ্রিয় জুড়িয়ে নিতে ব্যস্ত! পাশের নেটে ‘মাসল’ রাসেল যে বোলারদের অমন বেত-পেটা করছেন, তা দেখতে কারও মধ্যে ছিটেফোঁটা আগ্রহ পর্যন্ত দেখলাম না।
অবশ্য কেকেআর এ সবে অভ্যস্ত। এবং তাতে সোনালি-বেগুনির কখনও কিছু এসে-গিয়েছে বলে শোনা যায়নি। আসলে দিনের শেষে রেজাল্ট আসল। ট্রফি আসল। সে বিচারে কোহলিদের আরসিবি আলোকবর্ষ পিছিয়ে কেকেআরের চেয়ে। তা সে যতই তারকা-দ্যুতিতে আগুনরঙা আরসিবি আবেগ-যুদ্ধে এগিয়ে থাক। তিন-তিনখানা আইপিএল ট্রফি রয়েছে কেকেআরের। আরসিবির সেখানে আজ পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রাপ্তি বলতে দু’বার আইপিএল ফাইনাল। ব্যস!
শুনলাম, আগামী শনিবার কেকেআর মালিক শাহরুখ খান উপস্থিত থাকবেন খেলা দেখতে। তা, ‘বাদশা’ জানলে খুশি হবেন যে, তাঁর টিমকে গতবার তৃতীয় আইপিএল ট্রফি দিয়েছিলেন যিনি, সেই গৌতম গম্ভীরের অনুপস্থিতিতে টিমের জয়ী মনোভাব বা চ্যাম্পিয়ন সংস্কৃতিতে সামান্যতম টান পড়েনি। শনিবাসরীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে নাইট শিবির থেকে দু’টো বিষয় শোনা গেল। এক, টিমের পেসার বৈভব অরোরাকে নাকি বিশেষ দায়িত্ব দিতে পারে টিম। প্রস্তুতি ম্যাচে ভালো বোলিং করতে পারেননি বৈভব। যিনি গত বার হর্ষিত রানার সঙ্গে পূর্ণ আগ্রাসনে বোলিং করে গিয়েছেন। কেকেআর কোচ চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত এবং বোলিং কোচ ভরত অরুণ নাকি বৈভবকে বলেছেন যে, সাহসী বোলিং করতে। কারণ, ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে ব্যবহার করা নয়। তাঁকে ভাবা হচ্ছে ডেথ ওভার বোলার হিসেবে। শুনলাম, ‘ওয়াইড ইয়র্কার’ দেওয়ার সময় গতি কমাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বৈভবকে। দুই, ডোয়েন ব্র্যাভোর ক্লাস। এ যাবৎ যে ক’টা টিম মিটিং হয়েছে, প্রত্যেকটাতেই কেকেআর মেন্টর বলে গিয়েছেন যে, তিনি কিছুই বদলাতে যাবেন না। বরং বলে দিয়েছেন, গত বার তোমরা যা যা করেছো, যে ভাবে খেলেছো, সে ভাবে খেলো।
কে জানে কেন মনে হচ্ছে, আগামী শনিবার থেকে আগামী দু’মাস কেকেআরের এটাই মন্ত্র হতে চলেছে। টিম আগামী দু’মাস ‘সামার অফ টোয়েন্টি ফোর’-এ ডুবে থাকতে চলেছে। বিরাট-বিভূতি তার না পেলেও চলবে!