সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ছায়াসঙ্গী। সেই সূত্রেই তৃণমূলের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড'। কিন্তু পরের দেড় দশকে দিদির 'সবচেয়ে আস্থাভাজন' সেই মুকুল রায়ের কপালেই জুটেছিল 'ট্রয় নগরীর ঘোড়া'র তকমা! মমতার সঙ্গত্যাগ করে বিজেপিতেও যোগ দিয়েছিলেন মুকুল (Mukul Roy)। যদিও কয়েক বছরের মধ্যে আবার মমতার হাত ধরে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনও ঘটে। মুকুলের মৃত্যুদিনে তাঁর সঙ্গে তৃণমূল সর্বময় নেত্রীর সম্পর্কের সেই চড়াই-উতরাই এখন শাসকদলের অন্দরে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সোমবার একদা বিশ্বস্ত মুকুলের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা (Mamata Banerjee)। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘‘ওঁর সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন, বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিদায়ের খবর আমাকে বেদনাহত করেছে।’’ মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, মুকুল তৃণমূলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ‘প্রাণপাত’ করেছেন। দলের সর্বস্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। পরে তিনি ‘ভিন্ন পথে’ চলে গেলেও আবার ফিরে আসেন। মমতা লেখেন, ‘‘বাংলার রাজনীতিতে তাঁর অবদান এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কথা ভোলার নয়। দলমত নির্বিশেষে তাঁর অভাব অনুভব করবে রাজনৈতিক মহল।’’
মমতার সঙ্গে থেকে উত্থান হলেও, বঙ্গরাজনীতিতে মুকুলের (Mukul Roy) প্রবেশ ঘটেছিল বামেদের হাত ধরেই। সাতের দশকে কলেজে পড়ার সময় মুকুল জড়িয়ে পড়েছিলেন বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সঙ্গে। যদিও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিছু দিনের মধ্যেই সোমেন মিত্রদের হাত ধরে কংগ্রেসি রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় মুকুলের। তখন স্রেফ 'অনুগামী' হয়েই ছিলেন তিনি। রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে শুরু করে নয়ের দশকে মমতার সঙ্গে পরিচয় ঘটার পর। তখন থেকেই সোমেনের শিবির ছেড়ে দিদির ঘনিষ্ঠবৃত্তে ঢুকে পড়েছিলেন মুকুল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুকুল রায়। ছবি: সংগৃহীত।
১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে যখন মমতার দূরত্ব বাড়তে থাকে, সেই সময় মুকুলই নতুন দল গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। যার ফলশ্রুতি, বছর দুয়েকের মধ্যে তৃণমূলের জন্ম। সেই সময় মুকুলই ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু তখনও বঙ্গরাজনীতিতে ততটাও দাপুটে হয়ে উঠতে পারেননি মুকুল (Mukul Roy)। উল্কা গতিতে তাঁর পথচলা শুরুই হয় ২০০৬ সাল নাগাদ। ওই বছর মুকুলকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিলেন মমতা। কিন্তু ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হয় তৃণমূল। সেই ভোটে প্রার্থী হয়েছিলেন মুকুলও। তিনিও হেরে গিয়েছিলেন।
রাজ্য রাজনীতিতে ভালো সংগঠক হিসাবে খ্যাতি পেলেও, সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পায় মুকুলের 'দল ভাঙানোর নীতি'। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট থেকেই যে কাজ শুরু করেছিলেন রায় সাহেব, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তা কার্যত সংক্রমণের চেহারা নেয়। যে ধারা আজও বজায় রয়েছে বঙ্গরাজনীতিতে।
২০০৬ সালের ভোটের পর থেকেই মমতার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। রাজ্যে পালাবদলের অনুঘটক সেই আন্দোলনে প্রথম থেকেই নেত্রীর পাশে ছিলেন মুকুল। তখন থেকেই দলের অন্দরে প্রতিষ্ঠা পায়, মুকুলই তৃণমূলের 'নম্বর দুই'। তবে শুধু বাংলাই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও ছাপ ফেলতে শুরু করেন মুকুল। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটের কংগ্রেস এবং তৃণমূলের জোটের অন্যতম কারিগরও ছিলেন তিনি। সেই ভোটে বাংলায় কংগ্রেস-তৃণমূলের জোট ১৯টি আসন জিতেছিল। সেই সময় কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রীও হন মুকুল।
২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূলের জয়ের অন্যতম কারিগর মুকুলই ছিলেন। বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই মুকুলের দাপট বাড়তে থাকে বঙ্গরাজনীতিতে। ২০১২ সালে মমতার নির্দেশে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে দীনেশ ত্রিবেদী ইস্তফা দেওয়ার পর সেই দায়িত্ব পান মুকুল। যদিও বেশি দিন রেলমন্ত্রী ছিলেন না তিনি। পরের বছর মমতা ইউপিএ সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন মুকুল।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মুকুল রায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
রাজ্য রাজনীতিতে ভালো সংগঠক হিসাবে খ্যাতি পেলেও, সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পায় মুকুলের 'দল ভাঙানোর নীতি'। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট থেকেই যে কাজ শুরু করেছিলেন রায় সাহেব, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তা কার্যত সংক্রমণের চেহারা নেয়। যে ধারা আজও বজায় রয়েছে বঙ্গরাজনীতিতে। মুকুলের হাত ধরে দলের আড়েবহড়ে এই বৃদ্ধির সুফলও পেয়েছিল তৃণমূল। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে ৩৪টি আসন জিতেছিল তারা। কিন্তু ঘটনাচক্রে তার পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে মুকুলের পতনের শুরু।
সারদা কাণ্ডে নাম জড়িয়েছিল মুকুলের। সিবিআই তাঁকে জেরাও করেছিল। সেই সময় থেকেই দলনেত্রীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব। তাঁকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়েও দেন মমতা। তখন থেকেই কার্যত দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন মুকুল। তৃণমূলের অন্দরে একাংশের মত, ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ডায়মন্ড হারবার থেকে জিতে সাংসদ হওয়ার পর তাঁকে যুব সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। মুকুলের তাতে আপত্তি ছিল। তা প্রকাশ করার পর থেকেই তিনি নেত্রীর 'বিরাগভাজন' হন। তখন থেকেই মুকুলের বিজেপিতে যোগদানের জল্পনা শুরু হয়। মুকুলের নতুন গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তর চর্চা চলেছিল সেই সময়। যদিও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সে সব কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। ভোটের আগে তাঁকে আবার দায়িত্বও দিয়েছিলেন মমতা। সেই ভোটে জিতেওছিল তৃণমূল। কিন্তু মমতা-মুকুলের সম্পর্ক আর আগের পর্যায়ে ফেরেনি। এর পর ২০১৭ সালে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিল্লি গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন মুকুল।
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে যে ভাবে মমতা এবং মুকুলের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, তাতে সেই সময় অনেকেই মুকুলকে 'ট্রয় নগরীর ঘোড়া' বলতে শুরু করেছিলেন। তৃণমূলেরও অন্দরের একাংশের অভিমত, সেই সময় মুকুলকে ট্রয় নগরীর ঘোড়ার মতো ব্যবহার করে তৃণমূলকে ভাঙতে চাইছিল বিজেপি। প্রসঙ্গত, ইলিয়াড মহাকাব্যের সেই যুদ্ধের নির্ণায়ক অস্ত্রই ছিল ট্রয়ের ঘোড়া। কাঠের তৈরি যে ঘোড়াকে ট্রয়ের যোদ্ধারা নিজেরাই টেনে নিয়ে গিয়েছিল নগরীর অন্দরে। আর রাতের অন্ধকারে ঘোড়ার পেটে লুকিয়ে থাকা গ্রিক সেনারা বেরিয়ে এসে ছারখার করে দিয়েছিল ট্রয় নগরী। ঘটনাচক্রে, বিজেপি ছাড়ার সময়েও একই তকমা পেয়েছিলেন মুকুল। সেই সময় তাঁকে নিয়ে প্রবীণ বিজেপি নেতা তথাগত রায় লিখেছিলেন, ‘স্পষ্টই মুকুল রায় ছিলেন ট্রোজান হর্স। বিজেপি তাঁকে স্বাগত জানানোর পরে তিনি দলের সর্বভারতীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুললেন। রাজ্য নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেললেন। দলের অন্দরের সমস্ত কথা বিস্তারিত ভাবে জানলেন এবং ফিরে (তৃণমূলে) গেলেন।’
বিজেপিতে সাড়ে তিন বছর কাটিয়ে, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর ‘পুরনো ঘর’ তৃণমূলে ফিরে গিয়েছিলেন মুকুল। সে দিন ‘ঘরের ছেলে’ বলে মুকুলকে স্বাগত জানিয়েছিলেন মমতাই। আর অভিষেকের হাত থেকে উত্তরীয় পরে মুকুল বলেছিলেন, ‘‘বিজেপি থেকে বেরিয়ে খুব ভাল লাগছে। নতুন আঙিনায় এসেছি, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে... আর এটা ভেবে ভাল লাগছে, বাংলা আবার তার নিজের জায়গায় ফিরবে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন মমতা।’’
তবে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন করলেও পুরনো জায়গা আর ফিরে পাননি মুকুল। আর মমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তেও আর সেই ভাবে ঠাঁই হয়নি। এক প্রবীণ তৃণমূল নেতা বলেন, "মমতা-মুকুল জুটিই তৃণমূলের ভিত গড়েছিল। এই জুটিকে আবার একসঙ্গে দেখার সুযোগ পেলে দলের অনেকেই খুশি হতেন।"
