১৯৯৬ সালের ৯ জুলাই। আইনজীবী অলোককুমার দাসের কালো গাউন পরে আইনজীবী হিসাবে সওয়াল মমতার। কাট টু ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ ৩০ বছর পর ফের জনসমক্ষে সওয়াল 'আইনজীবী' মমতার। এবার সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বঙ্গবাসীর এসআইআর 'যন্ত্রণা'র কথা সকলের সামনে তুলে ধরলেন 'দিদি'। আর তা দেখে চোখের কোণে জল অলোকবাবুর। কারণ, আজও ওই শামলা আগলে রেখেছেন তিনি। তাই তো পুরনো দিনের কথা আজ যেন বড্ড মনে পড়ছে তাঁর।
আইনজীবী অলোককুমার দাস আজও আগলে রেখেছেন মমতার ব্যবহৃত গাউনটি। নিজস্ব চিত্র
তখন যুবনেত্রী। আন্দোলনের আঁচে টগবগ করে ফুটছে রক্ত। বাম সরকারের বিরুদ্ধে দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াইয়ের যোদ্ধা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সময়টা ১৯৯৩ সাল। একুশে জুলাই রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান। তৎকালীন প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের নির্দেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলি। বয়ে গেল রক্তগঙ্গা। প্রাণ হারান সবমিলিয়ে ১৩ জন। এই ঘটনায় ৪৭ জন কংগ্রেস কর্মীর বিরুদ্ধে দু'টি মামলা রুজু হয়। সেই মামলা দু'টির আইনজীবী ছিলেন অলোককুমার দাস। বছরের পর বছর ধরে চলে মামলার সওয়াল জবাব। ১৯৯৬ সালের ৯ জুলাই ব্যাঙ্কশাল কোর্টের ৬ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সওয়াল করার কথা ছিল আইনজীবী অলোককুমার দাসের। সেই মতো প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় আচমকাই হাজির মমতা।
১৯৯৬ সালের ৯ জুলাই ব্যাঙ্কশাল কোর্টের ৬ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সওয়াল করেন মমতা। গায়ে ছিল আইনজীবী অলোককুমার দাসের গাউন।
সকলকে অবাক করে জানান, দলীয় কর্মীদের হয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি সওয়াল করতে চান। কিন্তু কোর্টে সওয়ালের জন্য প্রয়োজন গাউন বা শামলা। শাড়ি পরিহিতা লড়াকু কন্যার কাছে তা যে নেই। তবে কি শুধু এইটুকুর জন্য মামলা লড়া হবে না তাঁর। মাত্র কয়েক মিনিটেই মুশকিল আসান। আইনজীবী অলোকবাবুর গাউনটি চেয়ে নিলেন। হাতে পাওয়ামাত্রই গায়ে চড়িয়ে নিলেন। তার মাঝেই ক্রমাগত মামলা সংক্রান্ত নানা তথ্য আইনজীবীর থেকে শুনে চলেছেন। আর মাথায় আইনি মারপ্যাঁচের ব্লুপ্রিন্ট ছকে চলেছেন। আদালত কক্ষে ঢুকে মমতা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি দমে যাওয়ার পাত্রী নন। তাঁর অকাট্য যুক্তি শুনে বোঝাই যায়নি প্রস্তুতি ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের। চাঁচাছোলা ভাষায় তাঁর সওয়াল শুনে দুঁদে আইনজীবীরাও তাজ্জব। সওয়াল জবাব শেষে বার অ্যাসোসিয়েশনের দু'নম্বর রুমে অলোকবাবুর সঙ্গে বসে মাটির ভাঁড়ে চা-ও খান।
১৯৯৬ সালে কালো গাউন গায়ে 'আইনজীবী' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি প্রকাশিত হয় 'সংবাদ প্রতিদিন' সংবাদপত্রে
তারপর রাজনৈতিক ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। তৃণমূল নেত্রী থেকে রেলমন্ত্রী, বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা হয়ে ওঠা। এই দীর্ঘ লড়াইয়ের মাঝে আর গাউন পরে আদালত কক্ষে আইনজীবীর ভূমিকায় দেখা যায়নি তাঁকে। কাট টু ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। আবারও আইনজীবীর ভূমিকায় মমতা। রাজ্যের এসআইআর 'ভুক্তভোগী'দের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে জোরাল সওয়াল করলেন 'দিদি'। পাঁচ মিনিটের জন্য বক্তব্য রাখার অনুমতি থাকলেও বাংলার সাধারণ মানুষের হয়ে গোটা পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশিক্ষণই বললেন। প্রধান বিচারপতিও তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শোনেন। একাধিক জায়গায় তাঁর যুক্তিসঙ্গত আপত্তির কথা মেনেও নেন।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি সৌজন্য: বার অ্যান্ড বেঞ্চ
৩০ বছর পর সুপ্রিম কোর্টে মমতার সেই একই রূপ দেখে ১৯৯৬ সালের কথা বড্ড মনে পড়ছে অলোকবাবুর। নিজের আলমারিতে আজও গুছিয়ে রেখে দিয়েছেন মমতার ব্যবহৃত গাউনটি। ফি বছর একবার ড্রাইওয়াশ করে তুলে রাখেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চিকচিক করে উঠছে চোখের কোণ। আনন্দাশ্রুতে ভিজল তাঁর গালও। অলোকবাবুর একটাই স্বপ্ন, গাউনটি মমতার হাতে তুলে দেওয়া। ভবিষ্যতে কোনও মিউজিয়ামে গাউনটি সংরক্ষণ করা হোক। একদিন না একদিন স্বপ্নপূরণ হওয়ার আশায় বুক বেঁধেছেন আবেগবিহ্বল আইনজীবী।
