shono
Advertisement

'সেলিম গব্বর সিং, সিপিএমে এখন ভয়ের পরিবেশ', বিতর্কের মাঝে দলের 'অন্যায়' নিয়ে অকপট প্রতীক উর

গত দুমাস অভিমানে দল থেকে সাত হাজার টাকাও নেননি প্রতীক উর।
Published By: Tiyasha SarkarPosted: 08:48 AM Feb 20, 2026Updated: 08:48 AM Feb 20, 2026

পরনের পাতলা হলদে শার্ট শরীরের সঙ্গে লেগে। একগাল দাড়ি। চোখেমুখে রাগ-বিরক্তি। সিপিএম থেকে প্রত্যাখ্যানের কষ্ট। তবু চোয়াল শক্ত, দিশাহারা নন প্রতীক উর রহমান। সামনে এক সমুদ্র ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত যেন তাঁর নেওয়া হয়ে গিয়েছে। রাজনীতি তিনি ছাড়ছেন না। যে বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখান থেকে রাস্তাটা পেরিয়ে বাঁকের ওপারে যাবেন রাজনীতির পথেই। তবু বৃহস্পতিবার শহর কলকাতার এক ডেরায় বসে যখন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের কথা উঠল। এক কথায় ফেলে আসা রাজনীতির পথের দিকে তাকিয়ে প্রতীক বললেন, "ওই লোকটাকে দল থেকে বের না করলে সিপিএম বাঁচবে না। ওই দলে এখন। ভয়ের পরিবেশ। আর মহম্মদ সেলিম গব্বর সিং। দলে একটা 'ডর কা মাহল' বানিয়ে রেখেছেন। তাঁর কথায়, "সিপিএমে থাকতে হলে কোনও কথা বলা যাবে না। ইয়েস স্যর বলতে পারলে থাকবে, না পারলে কমিউনিস্ট পার্টিতে তোমার কোনও জায়গা নেই।" এরই প্রেক্ষিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি মনে করেন প্রকৃত বামপন্থী নেত্রী। এম এমনকী, যে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন প্রতীক, মানুষকে দেওয়া পরিষেবা আর উন্নয়নে সেই ডায়মন্ড হারবারকে বদলে যেতে দেখেছে তাঁর স্বপ্নভরা দুই চোখ।

Advertisement

বামনেতা প্রতীক উর রহমান। ছবি-সোশাল মিডিয়া।

যতবার সিপিএমের নাম মুখে এনেছেন, শরীর কেঁপে উঠেছে। বয়স ৩৬ বছর। মাস গেলে পার্টি থেকে সাত হাজার টাকা মতো ওয়েজ পান। তাতেই সংসার চালাতে হয় এই হোলটাইমারকে। কিন্তু পার্টি কমরেডদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে সামান্য দু'-একটা প্রশ্নের জবাব না পেয়ে প্রশ্নের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। তাতেই কোণঠাসা হতে শুরু করেন। শেষ দুমাস অভিমানে আর সাত হাজার টাকাটা পার্টি থেকে নেননি। তাঁর কথায়, "আমি তো রাজ্য সম্পাদককে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু বামফ্রন্ট চেয়ারমান বিমান বসুকে শিখণ্ডি দাঁড় করালেন মহম্মদ সেলিম। আপনি হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন, আমায় ঢাকতে পারেন না।" সেলিমকে সরাসরি নিশানা করে প্রতীক বলে চলেন, "এই লোকগুলো সিপিএমের অভ্যন্তরে নিজেদের ব্যাক্তিস্বার্থ কায়েম করার জন্য দলের ইমেজ মতাদর্শকে ব্যবহার করে। দলকে সামনে রেখে শুধু নিজেদের চেয়ার বাঁচিয়ে রাখে, বলি দেয় অসংখ্য প্রতীক উরকে।"

মাস গেলে পার্টি থেকে সাত হাজার টাকা মতো ওয়েজ পান। তাতেই সংসার চালাতে হয় এই হোলটাইমারকে। কিন্তু পার্টি কমরেডদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে সামান্য দু'-একটা প্রশ্নের জবাব না পেয়ে প্রশ্নের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। তাতেই কোণঠাসা হতে শুরু করেন। শেষ দুমাস অভিমানে আর সাত হাজার টাকাটা পার্টি থেকে নেননি।

প্রতীককে নিয়ে জল্পনা খুব শিগগিরি তৃণমূলে যোগ দেবেন তিনি। প্রশ্ন নাকচ না করেও ঘুরিয়ে তিনি বলেছেন, "আমি এখন একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে। উলটোদিকে কী আছে জানি না। বাঁক পেরোলে উলটোদিকে খাদ হতে পারে, ফুল বিছানো রাস্তাও হতে পারে। অতীতের থেকে শিক্ষা নিয়ে আপাতত দিকে ইটিছি। সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, মৌচাকে ঢিল মেরেছেন তিনি। মৌমাছির হুল থেকে বাঁচতে একটা ডাক্তার দেখাতে যেতে হলেও দুটো লোক দরকার। তার জন্য রাজনীতির ময়দান তিনি ছাড়বেন না। তাঁর কথায়, 'রাজনীতির ময়দানে থাকলে বিধানসভা ভোটেও দেখা যাবে। আর লড়াই যদি করি তবে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই দেখা যাবে।"
এসআইআর পর্বে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে রাজ্যের আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের জন্য সওয়াল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা দেশ দেখেছে। তাঁর ভুয়সী প্রশংসা করে প্রতীক বলছেন, "এই কাজটা তো করা উচিৎ ছিল সর্বহারার দলের নেতাদের। সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি সেই কাজটা করলেন না, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম করলেন না। করলেন দূরদর্শী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভগৎ সিং যে কাজটা করেছিলেন, কোর্ট রুমে বোমা ফাটিয়েছিলেন কানে আওয়াজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। মানুষ মারার জন্য না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানুষের কথা বললেন সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে। বললেন শাসক তুমি বধির, এই গরিবের কথা শোনো।" লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে তাঁদের বিচার ভুল ছিল বলেও মেনে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, "আমরা বলেছিলাম এটা ভিক্ষা। কিন্তু কত লক্ষ গরিব খেটে খাওয়া মানুষের যে এতে কত সুরাহা হয়েছিল সেটা মাঠে-ঘাটে দেখেছি। বুঝলাম এটা আত্মসম্মান।"

বামনেতা প্রতীক উর রহমান। ছবি-সোশাল মিডিয়া।

বাংলা বাঁচাও যাত্রার সময় থেকে সিপিএমের সঙ্গে বিরোধটা প্রতীকের আরও তীব্র হয়। জেলাভিত্তিক তালিকায় এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের নাম নেই কেন সেই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। জেলা নেতৃত্বকে প্রশ্ন করলে প্রতীককে জানানো হয়, 'মিডিয়ায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা সুন্দর করে বলছে তাঁরা থাকবে।' সেলিমের সঙ্গে জেলা সম্পাদক রতন বাগচীর নামও করেছেন প্রতীক। বলেছেন, 'বলা হল যা বলব তাতে ইয়েস স্যর করবে। না হলে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে।' আমি তো জন্মেছি সংখ্যালঘু হয়ে। তাহলে? শুধু 'ইয়েস স্যর' বলিনি বলে জেলা সম্মেলনের পর থেকে গোটা লোকসভা কেন্দ্রে আর কোথাও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। রাজ্য সম্পাদককে বলি ডিওয়াইএফআই বা ক্ষেত মজুরের কোনও কমিটিতে আমায় নিয়ে নিন। জেলায় কোণঠাসা আমি, কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বললেন, 'ওইভাবে লাফিয়ে নেতা হওয়া যায় না!' প্রতীকের প্রশ্ন, "তার পর সিআইটিইউ আর মহিলা সমিতির সম্মেলনে দেখলাম পছন্দের কাউকে কাউকে কোর কমিটিতে নিয়ে নিলেন। আমার ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা কেন? সবাই তো হোলটাইমার। এই দ্বিচারিতা কেন? আমি ইয়েস স্যর বলিনি বলে?" সেলিমের তুলনা করতে গিয়ে প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের কথা এনেছেন তিনি। একবার একটা কথার বিরোধিতা করে কিছু উদাহরণ দিয়েছিলেন। প্রতীক বলছেন, "সূর্যবাবু আমায় পরে ডেকে কথাটা শুনেছিলেন। সঙ্গে আরও কিছু কথা বলে জানিয়েছিলেন, তুমি ঠিকই বলছো। কিন্তু ভাবার আরও অনেক রাস্তা আছে। বলে কিছু রেফারেন্সও দিয়েছিলেন। এই হল নেতা।"

হোলটাইমার হয়ে ইউটিউব আর ফেসবুক থেকে দলের নাম ভাঙিয়ে টাকা রোজগার করেন শতরুপ ঘোষ-সহ আরও অনেকেই। প্রতীকের কথায়, “নিশ্চয়ই দলকে জানিয়ে করেন। না হলে হোলটাইমার হয়ে তো ওটা করতে পারবেন না। আর তার জন্য লেভিও দেন নিশ্চয়ই।” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেমন লাগে? একটু থেমে "আমি ডায়মন্ডহারবারে ওনার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছিলাম। দলের জন্য। কিন্তু সত্যি বলতে বাধা নেই, উনি কাজ করেছেন।” ডায়মন্ড হারবার কি সত্যি মডেল? “সেটা ওনার দল বলবে"-প্রতীকের জবাব, "তবে ডায়মন্ডহারবার বদলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যবে থেকে মুখ্যমন্ত্রী সেই থেকেই দেখছি। এখন তো আরও কাজ হয়েছে।"

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement