দেশের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। বামেদের সরিয়ে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার সময় একটি শিশু জন্মাত ২১ হাজার টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে। এখন একজনের মাথাপিছু ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। রাজ্যের ঋণ বেড়ে ৮ কোটি ১৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সোমবার রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার তার বাজেট পেশ করতে চলেছে। যেখানে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে দান-খয়রাতি কমিয়ে ঋণ নিয়ন্ত্রণে ও নিজের আয় বাড়ানোয়। এবং লক্ষ্য পরিকাঠামো ও পরিকল্পিত খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। তা ছাড়া রাজ্যে শিল্পে বিনিয়োগ টানতে তৃণমূল সরকার যে ২০ হাজার কোটি টাকার শিল্প ভর্তুকি ও আর্থিক সুবিধা প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছিল, তা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ।
সবমিলিয়ে বিশাল ঋণের বোঝা ও বেকারত্ব সামলে রাজ্যের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করাই লক্ষ্য থাকবে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর। যে বাজেটে সামাজিক প্রকল্পের উপরও বিশেষ জোর দেওয়া হতে পারে কিন্তু বন্ধ করা হতে পারে পুজো, মেলা-খেলার নামে অর্থহীন দান খয়রাতি করে অর্থ নষ্ট। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান, রাজ্যের সদ্য প্রাক্তন বালুরঘাটের বিধায়ক অশোক লাহিড়ীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বপনবাবু। রাজ্যের উন্নয়নে অর্থ যে বাধা হবে না তা স্পষ্ট হয়েছে দুই বৈঠকেই। জিএসটি বাবদ বকেয়া প্রাপ্তি নিয়েও ইতিবাচক কথা হয়েছে। ফলে ডবল ইঞ্জিনের সরকারের প্রথম রাজ্য বাজেট ঘিরে আশার পারদ চড়ছে।
যেখানে আলিপুরদুয়ার, পশ্চিম বর্ধমান ও দক্ষিণ দিনাজপুরে নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কথা থাকতে পারে। সরকারে আসার পরই ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ইমাম-মোয়াজ্জেম-পুরোহিত ভাতা ক্যাবিনেটের দ্বিতীয় বৈঠকেই বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তৃণমূলের আমলে ২০১৮ সালে দুর্গাপুজোর জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া শুরু হলেও গতবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১০ হাজারে। সঙ্গে ছিল পুজোর বিদ্যুৎ বিলে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ছাড়। তা বন্ধও বিবেচনাধীন। যার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে বাজেটে। কারণ, সরকার চায় দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নমুখী প্রকল্প এবং বেকারত্ব হ্রাস। অর্থ দপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, "ঋণের ফাঁস থেকে ধীরে ধীরে বের হতে না পারলে কোনও বড় পরিকল্পনা করা অসম্ভব। সেটাই গুরুত্ব পাচ্ছে।"
রাজ্যের মোট আয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ এখন খরচ হয় ঋণের সুদ মেটাতে। উদাহরণ দিয়ে ওই আধিকারিক বলেন, "২০২৫ সালে রাজ্যের কর ও কর বহির্ভূত খাতে আয় ছিল ১.০৯ লক্ষ কোটি টাকা। অথচ সুদ মেটাতে গিয়েছে ৪৫ হাজার কোটি। আর গত সরকারের ঋণের বোঝা বেড়েছে বড় পরিকাঠামো উন্নয়ন খাতে অথবা জনমুখী নয়, বরং জনপ্রিয় হওয়ার পথ ধরতে গিয়ে। যা এই সরকার বন্ধের পথে হাঁটতে চায়। বামেরা রেখে গিয়েছিল ১.৯ লাখ কোটি ঋণ। সেটাই কয়েকগুণ বাড়িয়েছে তৃণমূল সরকার। ফলে ঋণের ফাঁসে দমবন্ধ রাজ্যের। নথিপত্রের জটে জিএসটি বাবদ যে বকেয়া কেন্দ্রের কাছে রয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে ইতিমধ্যেই তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই টাকা মিলবে ধরে নিয়েই বাজেটে ব্যবস্থাপনা রাখা হবে।
শিল্পে লগ্নি টানতে একাধিক পদক্ষেপ থাকছে বাজেটে। ল্যান্ডব্যাঙ্ক তো বটেই, শিল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও যাতে কোনও জটে না পড়তে হয় বিনিয়োগকারীদের তা ভাবা হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে আইন এনে ১৯৯৩ সাল থেকে চলে আসা শিল্পায়নে ভরতুকি ও আর্থিক যে সুবিধা তুলে দিয়েছিল তৃণমূল সরকার তা ফেরানো অথবা সংস্কারের কথা থাকছে বাজেটে। উত্তরবঙ্গের জন্য বিশেষ সংস্থান রাখা, শিলিগুড়িতে এইমস এবং উত্তরে আইআইটি, বিশ্বমানের ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের বিধান রাখা হতে পারে।
