বঙ্গ রাজনীতির রঙ্গ। ভোটের ময়দান ভুলিয়ে দিচ্ছে রক্তের টানও। রাজ্যের একাধিক কেন্দ্রে লড়াই একই পরিবারের মধ্যে। যেমন কাটোয়ায় কাকা রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছেন তাঁরই ভাইপো রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ লড়ছেন তৃণমূলের টিকিটে, আর রণজিৎ লড়ছেন কংগ্রেসের টিকিটে। তবে কাটোয়ার চেয়েও চমকপ্রদ লড়াই উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখরে। সেখানে মন্ত্রী দাদার বিরুদ্ধে লড়ছেন তাঁরই ভাই।
গোয়ালপোখরে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী মহম্মদ গোলাম রব্বানি। ২০১১ থেকে ওই কেন্দ্রের বিধায়ক রব্বানি। তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন তাঁরই ভাই মহম্মদ গুলাম সরওয়ার। গুলাম রব্বানিরা পাঁচ ভাইবোন। সরওয়ার সবচেয়ে ছোট। তিনি পেশায় চিকিৎসক। দীর্ঘদিন দিল্লিতে ছিলেন। শুরু থেকেই রাজনৈতিকভাবে দাদার বিরোধী। দিল্লি থেকে রাজ্যে ফিরেই যোগ দেন বিজেপিতে। একুশে বিজেপির টিকিটও পান। কিন্তু এবার তাঁকে টিকিট দেয়নি গেরুয়া শিবির। কিন্তু তাতে দমেননি গুলাম রব্বানির ছোট ভাই। বিজেপির টিকিট না পেয়ে সরওয়ার লড়বেন নির্দল প্রার্থী হিসাবে।
গোয়ালপখোরের বেশিরভাগ বাসিন্দা উর্দুভাষী মুসলিম। কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন কংগ্রেসের দখলে ছিল। প্রভাব ছিল ফরওয়ার্ড ব্লকেরও। রাজ্যের মন্ত্রী গোলাম রব্বানি নিজেও এক সময় কংগ্রেসে ছিলেন। দীপা দাশমুন্সীর ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচত ছিলেন। ২০১১ সালে কংগ্রেসের টিকিটে প্রার্থী বিধায়ক হন। ২০১৬ এবং ২০২১-এ জেতেন তৃণমূলের টিকিটে। একুশে তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির টিকিটে ৩২ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন তাঁর ভাই সরওয়ার। ব্যবধান ছিল ৭০ হাজারেরও বেশি।
স্থানীয়রা বলছেন, মন্ত্রী রব্বানি ৩ বার পরপর জেতায় বিরুদ্ধে স্থানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা দানা বাঁধছে। ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি-আইনশৃঙ্খলার অভিযোগে তিনি বেশ কোণঠাসা। তাছাড়া এলাকায় কংগ্রেসের প্রভাব বাড়ছে। বিশেষ করে ওই কেন্দ্রেরই প্রাক্তন বিধায়ক আলি ইমরান রামজ ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর গোয়ালপোখর ও চাকুলিয়ায় কংগ্রেসের হাওয়া উঠেছে। স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলেন, এবার জয়ের জন্য বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে রব্বানিকে। কিন্তু এখানেই টুইস্ট হিসাবে উঠে এসেছেন সরওয়ার।
কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা ভিক্টর নিজে গোয়ালপোখর ও চাকুলিয়া দুই কেন্দ্রেই প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে দল চাকুলিয়ায় প্রার্থী করে। গোয়ালপোখরে কংগ্রেস টিকিট দেয় পুরনো কংগ্রেসি এবং ভিক্টর বিরোধী হিসাবে পরিচিত মাসুদ মহম্মদ নাসিম আহসানকে। বেশিরভাগ ভোটার সংখ্যালঘু হওয়ায় ওই কেন্দ্রে নাসিমের সঙ্গেই রব্বানির মূল লড়াই হওয়ার কথা। কিন্তু নাসিমকে প্রার্থী করায় ক্ষুব্ধ ভিক্টর, গুলাম সরওয়ারকে গোয়ালপোখর থেকে নির্দল হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন। এমনকী নির্দল প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দেওয়া সত্ত্বেও দলীয় পতাকা ধরিয়ে তাঁকে কংগ্রেসে যোগদান করিয়েছেন। গোয়ালপোখরে কংগ্রেসের অন্দরে ভিক্টরের অনুগামী হিসাবে যারা পরিচিত, তাঁরা সবাই ধীরে ধীরে সমর্থন করা শুরু করেছেন সরওয়ারকে। ফলে আখেরে দুর্বল হয়ে পড়ছে কংগ্রেস। মোদ্দা কথা, সরওয়ার দাদাকে হারানোর জন্য ভোটের ময়দানে নামলেও আখেরে তিনি ভোট কেটে রব্বানির সুবিধাই করে দিচ্ছেন।
