ভোটের (West Bengal Assembly Election) তিনদিন আগে বাইক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগেই হাই কোর্টের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল নির্বাচন কমিশনকে। এবার এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিই খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্ট। ৭২ ঘন্টার বাইক বন্ধের বিজ্ঞপ্তি খারিজ করে হাই কোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা রাও জানিয়েছেন, ৭২ ঘণ্টা আগে থেকে নয়, ভোটগ্রহণের দিনের ১২ ঘন্টা আগে থেকে জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাইক বা মোটরসাইকেলে পিছনে যাত্রী বহন করার অনুমতি দেওয়া হবে না। যদিও চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা, পারিবারিক অনুষ্ঠান অথবা স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের আনা-নেওয়া পারিবারিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে হাই কোর্টের নির্দেশনামা।
ভোটগ্রহণের দিন ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের ভোট দিতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাইকে চাপানো যাবে। পাশাপাশি, চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের মতো অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে, সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের মোটরসাইকেলে পেছনে বসিয়ে চলাচলের অনুমতি থাকবে। তবে ওলা, উবের, সুইগির মতো যাতায়াত বা খাবার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন তারা এর আওতায় আসবে না। অফিসেও যাতায়াতের ক্ষেত্রে সঠিক পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করা যাবে। ব়্যালি করার ক্ষেত্রে কিছুটা কড়া মনোভাব রেখেছে আদালত। সেক্ষেত্রে কমিশনার নির্দেশ মেনে ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ব়্যালি করা যাবে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, মোটরসাইকেল র্যালির বিষয়ে নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা পূর্বে কিংবা নির্বাচনের দিন কোনো প্রকার সহিংসতা এড়ানোর লক্ষ্যে কিছুটা যৌক্তিকতা থাকলেও, ৪৮ ঘণ্টা পূর্বেই কোনো ব্যক্তির মোটরসাইকেল চালানোকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করাটা যৌক্তিক নয়।
বাইক চলাচলে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাই কোর্টের তোপের মুখে শুক্রবার বাইক ব্যবহার করে হুমকি, অপরাধ, দুষ্কর্মের যুক্তি খাড়া করে ছিল কমিশন। কিন্তু সেই যুক্তি ধোপে টিকল না। ইডি। বিচারপতি রাওয়ের এজলাসে মামলায় কমিশনের আইনজীবী জীষ্ণু চৌধুরীর দাবি ছিল, আমাদের (কমিশন) কাছে অনবরত অভিযোগ আসছে যে বাইক চড়ে এসে হুমকি দিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, বাইকে করে পালিয়ে যাওয়া সহজ। বাইক অত্যন্ত সহজলভ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই দু'চাকা ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হয়। একজন বাইক চালিয়ে আসছে এবং অন্যজন পিছনের সিটে বসে দুষ্কর্ম করে চলে যাচ্ছে। এমনকি, বাইকে করে নাকা তল্লাশির এলাকা এড়িয়ে যাওয়া সহজ।
আদালতের প্রশ্ন, "আইনের কোন ধারায় আপনারা এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন ?" যদিও এর সঠিক জবাব দিতে পারে নি কমিশন। আইনজীবীর দাবি, ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ ধারা অনুযায়ী অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করানোর জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রভূত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাই বাইক বাহিনীর দাপট কমাতে এই ধরনের পদক্ষেপ করতেই পারে সংস্থা। রাজ্যের অতীতের ভোটের রেকর্ড এবং দীর্ঘদিনের তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে মোটরসাইকেলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এপ্রসঙ্গে আদালত আরও জানতে চান, কিন্তু তার জন্য তিন দিন আগে থেকে বাইক বন্ধ কেন? আপনারা এত কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করেছেন, নাকা চেকিং হচ্ছে, পোলিং স্টেশনের ২০০-৩০০ মিটার দূর থেকে চেক করে বাইকের প্রবেশ দেওয়া বন্ধ করে দিন। সর্বত্র বাইক চলাচলে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কি ?
আদালতে আবেদনকারী ও রাজ্যের যুক্তি ছিল, এই নির্দেশিকা জারি করার ক্ষমতার উৎস কোথায় সেটা কমিশন জানাতে পারেনি। আইন তৈরির ক্ষমতা কমিশনের নেই। আইনের কোন ধারায় বাইক নিষিদ্ধ করা হল জানাতে পারেনি কমিশন। একই সঙ্গে, কমিশনের একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি মাদ্রাজ ও গুজরাট হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্তে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকা প্রয়োজন। কমিশনের কাছে যে সমস্ত তথ্য রয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য এই পদক্ষেপ। সামগ্রিকভাবে বাইক চলাচল বন্ধ করা হয়নি। ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কমিশন অস্বাভাবিক কিছু করছে না। সবাইকে ফ্রি হ্যান্ড দিয়ে দিলে নানারকম অশান্তির ঘটনা ঘটতে পারে। সেই জন্য আগাম এই ব্যবস্থা। শুধুমাত্র পাবলিক সেফটির জন্য এটা করা হয়েছে, অন্য কিছু নয়। এর সাপেক্ষে রিপোর্টও দেওয়া হয় আদালতে। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি আদালত।
