কেউ বলছেন ১১০, কেউ বলছেন ১২৫। রাজ্যের প্রথম দফার নির্বাচনের পর বিজেপি নেতাদের হাবভাব এমন যেন প্রথম দফাতেই জিতে গিয়েছেন তাঁরা। ক্ষমতা দখল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ২০২১ সালেও ভোটের পর এমনই আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীরা। সেবারও তৃণমূল প্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী ছিল। এবারও। রাজ্যের শাসকদলের অঙ্ক, মানুষের ভোটদানের স্বতঃস্ফূর্ততা আসলে তাদের পক্ষেই গিয়েছে। তাই বিজেপি নেতাদের আস্ফালন অর্থহীন। শাসকদলের অঙ্ক বলছে, প্রথম দফায় আগের চেয়েও আসন বাড়বে তাদের।
কিন্তু কোন অঙ্কে এত আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল? শাসকদলের মূল ভরসা অবশ্যই সেই এম ফ্যাক্টর। এম অর্থাৎ মহিলা, মুসলিম এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। প্রথম দফার ভোটে জেলায় জেলায় মহিলা ভোটারদের ভিড় ছিল রীতিমতো লক্ষণীয়। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যে প্রথম দফায় ৯৩ শতাংশ মহিলা ভোটারই ভোট দিয়েছেন। শাসকদলের বিশ্বাস, এই মহিলা ভোটের সিংভাগ পড়বে জোড়াফুলেই। বস্তুত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, স্বাস্থ্য সাথীর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করেছেন, তাতে একটি শক্তিশালী মহিলা ভোটব্যাঙ্ক তিনি তৈরি করতে পেরেছেন। তাছাড়া মমতার নিজের 'ঘরের মেয়ে' ভাবমূর্তিও মহিলাদের তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে। যা এত সহজে তাঁর সঙ্গ ছাড়বে না।
প্রথম দফার ভোটে জেলায় জেলায় মহিলা ভোটারদের ভিড় ছিল রীতিমতো লক্ষনীয়। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যে প্রথম দফায় ৯৩ শতাংশ মহিলা ভোটারই ভোট দিয়েছেন। শাসকদলের বিশ্বাস, এই মহিলা ভোটের সিংভাগ পড়বে জোড়াফুলেই।
তৃণমূলের দ্বিতীয় এম ফ্যাক্টর হল মুসলিম। রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে ব্যাপক হারে ভোট পড়েছে। কিছু কিছু পকেটে সংখ্যালঘু ভোটে হয়তো সামান্য চিড় ধরাবে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ বা আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, তবে সেটা নগণ্যই। সার্বিকভাবে SIR-অত্যাচারে ক্ষুব্ধ সংখ্যালঘুরা বিজেপির হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে তৃণমূলের পাশেই থাকবে বলে আশাবাদী শাসক শিবির। তাছাড়া বিজেপি যেভাবে নিজেদের সংকল্প পত্রে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেটাতেও ভীত সংখ্যালঘুরা। তাই কোনও কোনও মহলে অসন্তোষ থাকলেও সংখ্যালঘুরা তৃণমূলের সঙ্গে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
মহিলা ভোটারদের লাইন। ফাইল ছবি।
তৃণমূলের তৃতীয় এম 'ফ্যাক্টর' অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। রাজ্যে বিজেপি যতই চেষ্টা করুক, দিল্লির নেতারা এসে যতই রাজ্য দখলের জন্য সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ নীতি গ্রহণ করুক, তাঁরাও জানেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারেকাছে কোনও গ্রহণযোগ্য মুখ তাঁদের কাছে নেই। মমতা এখনও বাংলা-বাঙালির 'রক্ষাকর্তা' হিসাবে এখনও মমতার উপরই আস্থা রাখবেন ভোটাররা। অন্তত তৃণমূলের এমনটাই ধারণা।
আরও একাধিক ফ্যাক্টর তাঁদের পক্ষে কাজ করবে বলে মনে করছে শাসক শিবির। তাৎপর্যপূর্ণভাবে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্য থেকে এসেছেন স্রেফ ভোট দিতে। এমনিতে এই পরিযায়ীদের একটি বড় অংশ বিধানসভা বা লোকসভা ভোটে ভোট দিতে আসেন না। পঞ্চায়েত ভোটে নিজেদের উদ্যোগে বহু নেতা এদের নিয়ে আসেন। কিন্তু এবার এই পরিযায়ীরা ভোট দিতে এসেছেন স্রেফ এসআইআর ভীতিতে। অনেকেরই ধারণা এবার ভোট দিতে না পারলে পরে সমস্যা হবে। তৃণমূল মনে করছে, যেভাবে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার বাড়ছে, তাতে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট অন্তত অন্য কোনও ভোটবাক্সে যাবে না। তাছাড়া ভোট দেওয়ার সময় SIR হেনস্তার কথাও মাথায় রেখেছেন পরিযায়ীরা।
ভোটের লম্বা লাইন। নিজস্ব চিত্র।
তাছাড়া বিপুল ভোটের হার নিয়ে যে দাবি করা হচ্ছে, সেটাও সত্যি নয় বলেই মনে করছে শাসকদল। ভোটের হার বাড়ার মূল কারণ এসআইআরে বহু মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ যাওয়া, অন্য কিছু নয়। সংখ্যার নিরিখে এবার আগের বারের চেয়ে ৮৩ হাজারেরও বেশি ভোট কম পড়েছে। এতেই প্রমাণ হয়, বাংলায় এ বারের ভোটের ধরনও অন্যান্য বারের মতোই হয়েছে। আলাদা কিছু হয়নি। ফলে এবারের ভোটের ধরনও আগের বারের চেয়ে বিশেষ বদলায়নি। ফলাফলও বদলাবে না। শাসক দল অন্তত প্রত্যয়ী, রেজাল্ট হবে আগের চেয়ে অনেক ভালো।
