“একটু বাইরে আসো গো। তামান্নার মা এয়েচে... সবাই ওরে ভোট দিও গো, মেয়েটারে বিচার দেওয়াতেই হবে।” নদিয়া জেলার কালীগঞ্জ বিধানসভা এলাকার হাটখোলা অঞ্চলের এক প্রত্যন্ত গ্রাম কাদিহাটিতে এমনই হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে আজকাল। দুপুরে স্থানীয় প্রধানের বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এলাকার বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিএম প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন। যাঁকে বাংলার মানুষ এই নামের থেকেও বেশি ভালো চেনেন 'তামান্নার মা' হিসাবে।
যে মেয়েকে কোলেপিঠে করে একটু একটু করে বড় করে তুলেছিলেন, তাঁকে হারানোর পর সাবিনার কান্না দেখেছিল তামাম দুনিয়া। সেই সাবিনাই যেন এখন ইস্পাতকঠিন। চোখের জল শুকিয়ে এখন ঝরছে আগুন। বলছিলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল, ওই ক্রিমিনালগুলারে শেষ করে দিই। পরে তামান্নার আব্বু বোঝায়। তাহলে তো ওদের সঙ্গে আমার কোনও পার্থক্য থাকে না। তখনই ঠিক করি, আইনের পথে ওদের শাস্তি দেব। যে লড়াই শুরু করেছি, তার শেষ দেখেই ছাড়ব দাদা।”
২০২৫ সালের ২৩ জুন, কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকদের বিজয় মিছিল চলাকালীন যার মৃত্যু হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যে ঘটনার নিন্দা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নির্দেশেই কয়েকঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছিল অভিযুক্ত। সেই তামান্নার মা-ই এবার নির্বাচনে সিপিএম প্রার্থী। যাঁর নাম ঘোষণার সময় বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু উল্লেখ করেছিলেন, ‘শহিদকন্যার মাতা’ হিসাবে।
এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচারে কালীগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন। নিজস্ব ছবি
বছরও ঘোরেনি আদরের মেয়েকে হারিয়েছেন। যে মেয়েকে কোলেপিঠে করে একটু একটু করে বড় করে তুলেছিলেন, তাঁকে হারানোর পর সাবিনার কান্না দেখেছিল তামাম দুনিয়া। সেই সাবিনাই যেন এখন ইস্পাতকঠিন। চোখের জল শুকিয়ে এখন ঝরছে আগুন। বলছিলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল, ওই ক্রিমিনালগুলারে শেষ করে দিই। পরে তামান্নার আব্বু বোঝায়। তাহলে তো ওদের সঙ্গে আমার কোনও পার্থক্য থাকে না। তখনই ঠিক করি, আইনের পথে ওদের শাস্তি দেব। যে লড়াই শুরু করেছি, তার শেষ দেখেই ছাড়ব দাদা।” এই লড়াইয়ের শক্তি কোথা থেকে পাচ্ছেন? তিনি তো গ্রামবাংলার এক সাধারণ পরিবারের হেঁসেল সামলানো মা। বলছিলেন, “আল্লা আর তামান্না সবসময় আমার সঙ্গে আছেন। আর আছেন সেলিম সাহেব, আমার ছোট বোন মীনাক্ষী (মুখোপাধ্যায়) আর বিমানবাবু।”
যেহেতু দল তাঁকে প্রার্থী করেছেন, তাই চষে বেড়াচ্ছেন এলাকার বিভিন্ন প্রান্ত। চৈত্রের দাবদাহে দু’বেলা করছেন প্রচার। মাঝে দুপুরের দিকে কোনও না কোনও দলীয় কর্মীর বাড়িতে কিছু খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছেন। বললেন, “এই প্রচার যেন আমাকে বাঁচার পথ দেখাল। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে যখন অন্য বাচ্চাদের দেখছি, একটু আদর করছি। মনে হচ্ছে এই তো আমার তামান্না।” একটু থেমেই আবার বললেন, “গ্রামে যখন দেখি ওই ক্রিমিনালগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, বুকের ভিতর আগুন জ্বলে। পুলিশকে খবর দিই। ওরা আসার আগেই কীভাবে যেন পালিয়ে যায়। আর কোনও তামান্নাকে যেন তার মায়ের কোল খালি করে চলে যেতে না হয়, এটাই আমার লক্ষ্য।”
মাস নয় আগেকার তামান্নার মা ও আজকের সিপিএম প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন যেন একেবারে দু’টি আলাদা চরিত্র। আলাদা মানুষ। সন্তান হারানো নিরুপায় মা এখন বদলে গিয়েছেন অদম্য জেদের এক মহীয়সীতে। দেখার শুধু, তাঁর মতো এই এলাকার রাজনীতিতে কোনও বদল আসে? নাকি এই কেন্দ্রে মানুষ আস্থা রাখেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধির উপরই? তবে আপাতত ইনসাফের দাবিতে এক মায়ের লড়াই যে নজর কাড়ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
