shono
Advertisement

Breaking News

Darjeeling

গোর্খাল্যান্ডের ভঙ্গুর স্বপ্নে আর ভরসা রাখছে না শৈলশহর! দার্জিলিং মজেছে 'উন্নয়নের পাঁচালি'তে

তবে বিমল গুরুং ও বিজেপি পুরনো কৌশল পরিত্যাগ করতে নারাজ। ওরা ফের 'স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান'-এর আবেগ চাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে।
Published By: Kousik SinhaPosted: 04:25 PM Apr 02, 2026Updated: 04:46 PM Apr 02, 2026

শৈলশহরে ইতিউতি তাকালে এখনও নজর কাড়বে 'উই ওয়ান্ট গোর্খাল্যান্ড' পোস্টার! কয়েক বছর আগেও ভোট এলে নতুন পোস্টারে ছয়লাপ হতো দার্জিলিং পাহাড়। কালো অথবা সবুজ অক্ষরে লেখা পৃথক রাজ্যের দাবি জ্বলজ্বল করতো। এবারও অন্যথা হয়নি! ভোট আসতেই নতুন করে গোর্খাল্যান্ডের দাবি উঠতে শুরু করেছে পাহাড়ে! কিন্তু এবার তা অনেকটাই ফিকে। গোর্খাল্যান্ডের দাবিই যে পাহাড়ের একমাত্র 'রাজনৈতিক ভাষা' নয়, তা ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে! দার্জিলিং, কার্শিয়াং ও কালিম্পং পাহাড়ের তিন আসনেই ক্রমশ জোড়ালো হয়েছে 'পরিবর্তন'-এর ইস্যু। বিশেষ করে রাস্তা, পর্যটন, যানজট, পানীয় জল, স্কুল, হাসপাতাল, চা শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরির কথা উঠে আসছে ভোটারদের বক্তব্যে। স্বভাবতই গোর্খাল্যান্ডের স্বপ্ন এবং বাস্তব রাজনীতির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের মতে, এবার কল্পনা ও বাস্তবের সংঘাতের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে দেখতে পাওয়া যাবে।

Advertisement

কিন্তু কেন এমন বদল? পাহাড়ের রাজনীতি কল্পনার রাজ্য থেকে সরে দৈনন্দিন সমস্যার দিকে ঝুঁকছে! কম তো হয়নি! কয়েক দশক ধরে, পাহাড়ের রাজনীতি জাতিসত্বার আবেগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ধ্বংস ছাড়া লাভ কিছু হয়নি। হয়তো তাই পুরোনো দাবির পাশাপাশি এখন রাস্তা মেরামত, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, পানীয় জলের সমস্যার সমাধান, স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নের দাবি ভোট প্রচারে প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে। এবার ভোটের আসরে একদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থনে অনীত থাপা নেতৃত্বাধীন ভারতীয় গোর্খা প্রজাতন্ত্রী মোর্চা (বিজিপিএম)। অন্যদিকে বিজেপি ও বিমল গুরুং নেতৃত্বাধীন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা জোট এবং অজয় এডওয়ার্ড নেতৃত্বাধীন ভারতীয় গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট (আইজিজেএফ)। অনীত থাপা প্রচারে বের হয়ে ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের দিন শেষ! রাজ্য সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এখন পাহাড়ে উন্নয়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, "আমাদের রাজনীতি মর্যাদার সঙ্গে উন্নয়ন। মানুষ রাস্তা, জল, স্কুল এবং চাকরি চায়। শুধু আন্দোলন করে পরিবারের ভরণপোষণ হয় না।" অন্যদিকে অজয় এডওয়ার্ড 'পরিবর্তন চাই' ডাক দিয়ে প্রচারে ঝাপিয়েছেন। কিন্তু কীসের পরিবর্তন? অজয় বলেন, "ভোট এলেই বিজেপি পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কথা বলে ভোট নিয়ে যায়। জয়লাভের পর ফিরেও তাকায় না। এবার সেটা চলবে না। আমরা চাই মানুষ পাহাড়ের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে ভোট দিতে যাক।" 

কয়েক দশক ধরে, পাহাড়ের রাজনীতি জাতিসত্বার আবেগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ধ্বংস ছাড়া লাভ কিছু হয়নি। হয়তো তাই পুরোনো দাবির পাশাপাশি এখন রাস্তা মেরামত, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, পানীয় জলের সমস্যার সমাধান, স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নের দাবি ভোট প্রচারে প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং পরিবর্তনকামী ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে স্বচ্ছতা, আঞ্চলিক পরিচয় এবং পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নের স্লোগান সামনে রেখেছেন। তবে বিমল গুরুং ও বিজেপি পুরনো কৌশল পরিত্যাগ করতে নারাজ। ওরা ফের 'স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান'-এর আবেগ চাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাদের যুক্তি রাস্তাঘাট, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ গোর্খা পরিচয়ের অমীমাংসিত প্রশ্নের বিকল্প হতে পারে না।
কিন্তু সময় পাল্টেছে। 'উই ওয়ান্ট গোর্খাল্যান্ড' স্লোগানে যে খুব একটা চিড়ে ভিজছে না সেটা লেবংয়ের বাসিন্দা মনবাহাদুর ছাত্রীর কথায় স্পষ্ট। তিনি বলেন, "এক সময় পাহাড়বাসী গোর্খাল্যান্ডের স্বপ্ন পূরণের আশায় জন্য ভোট দিয়েছে। এখন জানতে চায় তাদের গ্রামের রাস্তা কবে মেরামত হবে। পানীয় জলের সমস্যা কবে মিটবে।”

ফাইল ছবি।

কার্যত আশির দশকে জিএনএলএফ-এর ধ্বংসাত্মক আন্দোলন থেকে শুরু করে বিমল গুরুংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার উত্থান পর্যন্ত পাহাড়ের রাজনীতি গোর্খাল্যান্ডের আবেগ ঘিরে ঘুরপাক খেয়েছে। ২০০৯ সালের পর বিজেপি সেই সুযোগ নিয়ে পাহাড়ের জিএনএলএফ, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মতো দলগুলোর সঙ্গে জোট করে বিভিন্ন নির্বাচনে জায়গা করে নেয়। দার্জিলিং লোকসভা আসনটি দখল করে। প্রতিটি নির্বাচনে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল 'রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান'। কিন্তু তা হয়নি। উল্টে মাঝে মধ্যেই বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্রকে উসকে কেন্দ্রের একাধিক পদক্ষেপকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। যেমন গত কয়েকমাস আগেই পাহাড়ে স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি তথা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করা হয়। আর তা রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা না করেই করা হয় বলে অভিযোগ। এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিও লেখেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির আর প্ররোচনায় পা দিতে নারাজ পাহাড়বাসী! এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে তা স্পষ্ট বলেই মনে করছেন পাহাড়ের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ।

যদিও এর মধ্যেই এসআইআর প্রক্রিয়া সেই বিশ্বাসভঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দার্জিলিং জেলায় এসআইআর-এর ফলে পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ১ লক্ষ ২২ হাজার নাম ডিলিট হয়েছে। এর মধ্যে দার্জিলিং আসনে প্রায় ২৫ হাজার, কার্শিয়াং আসনে ১৮ হাজার ৩৯৪ এবং কালিম্পং আসনে প্রায় ১৭ হাজার নাম রয়েছে। ডিলিট ভোটারের তালিকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে ডিলিট ভোটারের সংখ্যা ২০২১ সালের নির্বাচনে পাহাড়ের তিন আসনে জয়ের ব্যবধানের কাছাকাছি অথবা তার চেয়েও বেশি। যেমন, দার্জিলিং আসনে প্রায় ২১ হাজার ভোট এবং কার্শিয়াং আসনে ১৫ হাজার ভোট এবং কালিম্পং আসনে ৪ হাজার ভোটে প্রার্থীরা জয়লাভ করেছিলেন। স্বভাবতই এসআইআর সমতলের মতো পাহাড়েও রাজনৈতিক সমীকরণ পালটে দিতে পারে বলেই শঙ্কা রাজনৈতিক মহলের।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement