একুশের বিধানসভা ভোটে বাংলার ২৯৪ আসনে তৃণমূলের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল ২১৩। ভয়ঙ্কর ভরাডুবি দেখাল ছাব্বিশের নির্বাচন। জনতার রায়ে এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের দখলে রইল মাত্র ৮০ কেন্দ্র। তাবড় তাবড় নেতা মন্ত্রী থেকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী। ধরে রাখতে পারেননি নিজেদের কেন্দ্র। গড় হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমানের মতো জেলাগুলিতেও উঠেছে গেরুয়া ঝড়। কিন্তু ৫ বছরের ব্যবধানে এমন ধরাশায়ী অবস্থা কীভাবে? ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলার 'অগ্নিকন্যার' লড়াই ছাব্বিশেই ইতি টানল? বিভিন্নমহল থেকে একাধিক কাটাছেঁড়া চললেও, এবার দলের অন্দরেই ফোঁস করে উঠছেন নেতারা। বলছেন, 'অভিষেকই যত নষ্টের গোড়া। দলে কর্পোরেট কালচারটাই কাল হল।'
এবার অভিষেকের বিরুদ্ধে সরব তৃণমূলের যুবনেতা কোহিনূর মজুমদার। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, "হারের পিছনে এক এবং একমাত্র কারণ অভিষেক ব্যানার্জি। দলটাকে কর্পোরেট একনায়কতন্ত্রে পরিণত করল। যে দল গ্রাসরুটে মিশে থাকার কথা, তাকে নিয়ে চলে গেল ক্যামাক স্ট্রিটের ৬ তলায়। ১৯৯৮ সাল থেকে লড়াই করা নেতাদের পাত্তাই দেয়নি অভিষেক।" কোহিনূরের দাবি, "এই নির্বাচনে বিজেপি জেতেনি, কর্মীদের চোখের জলে পরাজয় হল তৃণমূলের। বিশ্বের যত ফেরেব্বাজ সবাই অভিষেকের দলে। আরজি করের ঘটনা ঘটেছে। যখন দল সঙ্কটে তখন কোথায় ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়? দলটা আইপ্যাক-অভিষেক ব্যানার্জি আর ক্যামাক স্ট্রিটে কেন্দ্রীভূত হয়েই আজ এই অবস্থা।"
নাটাবাড়ির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মুখেও তৃণমূলের পরাজয়ের নেপথ্যে উঠে এল সেই অভিষেকের নামই। তাঁর বিস্ফোরক দাবি, "আমার মনে হচ্ছিল রাজ্য পর্যায়ে দলটা দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। একটা দিদি, আর একদিকে অভিষেক। দিদির সিদ্ধান্তগুলো যদি মানা হত, তাহলে দল আজ ক্ষমতায় থাকত। অভিষেক কর্পোরেট স্টাইলে করতে গিয়ে পুরোটা তছনছ করে দিল। যে সমস্ত পরিযায়ীরা এসে দলের ক্ষমতা দখল করে আছে, এগুলোকে ঝেঁটিয়ে তাড়াতে হবে। সুব্রত বক্সীর মতো লোককে একঘরে করে রাখা হয়েছে। দিদি পুরনো কর্মীদের এখনও ভালবাসেন। কিন্তু, নানা বাধ্যবাধকতায় নিজের সিদ্ধান্তে ঠিক থাকতে পারেননি।"
অন্যদিকে আগেই দূরত্ব তৈরি করেছিলেন দলের সঙ্গে। এবার তৃণমূলের পতন হতেই মুখ খুললেন বারাসতের বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। তিনি বলেন, "জনতার কাছে সব হিসেব আছে। ভাল, খারাপ সব লেখে। যেমন মা সব জানে, তেমনই জনতাও সব জানে। আমরা হয়তো চালাকি করে বেরিয়ে যাই। সেটা সাময়িক। ফু দিলে চকচকে সত্য বেরিয়ে যায়। পার্ক স্ট্রিট, কামদুনি, তারপর আরজি কর। পরপর জায়গাগুলোয় আমার মনে হচ্ছিল মানুষকে ঠিকমতো অ্যাড্রেস করা হচ্ছে না। সার্ভিস করা হচ্ছে না।"
দুর্নীতি, তোলাবাজির মতো ইস্যুকে সামনে রেখে বরাবর বাংলার শাসকদল তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিরোধীরা। কিন্তু দলের অন্দরেই যে চোরাস্রোত লুকিয়ে ছিল, তা অনেক আগেই টের পেয়েছিলেন কোণঠাসা নেতা-কর্মীরা? অভিষেক রাজপাটে 'দলটার ভবলীলা সাঙ্গ' হতেই সামনে এল আসল সত্যি!
