বাকিদের সঙ্গেই প্লেন থেকে বিমানবন্দরে নামলেন পরিপাটি পোশাকের চার তরুণ। ব্যাগ চেকিংয়ের সময়ে দেখা গেল, বেবিফুডের ক্যান রয়েছে তাঁদের কাছে। এ পর্যন্ত অন্ত্যন্ত সাধারণ এই গল্প। বাড়ির শিশুটির জন্য বেবিফুড নিয়ে যাওয়া এমন কি আর আশ্চর্য ব্যাপার? কিন্তু হঠাৎই আটকে দেওয়া হল তাঁদের। পুলিশ এসে তল্লাশি শুরু করল। ব্যাগের অন্য সমস্ত তন্নতন্ন করে খুঁজল তো বটেই, বেবিফুডের ক্যানগুলোও খুলে ফেলল তারা। আর ওমনি উপস্থিত সকলের চক্ষু চড়কগাছ! বেবিফুডের ক্যানে রয়েছে মাদক তৈরির নানাবিধ সামগ্রী! যা কাজে লাগে হেরোইন ও ব্রাউন সুগার তৈরিতে!
গোয়েন্দাদের বিশ্বাস, স্থলপথে মাদক পাচার কঠিন হতেই আকাশপথের অবলম্বন পাচারকারীদের। বাধা না পেলে, মণিপুর থেকে এই কাঁচামাল পৌঁছাবে মালদায়, যেখানে মাদক তৈরি ও পাচারের কাজ চলে।
মাদক পাচারের এমন অভিনব কাহিনি অবশ্য খুঁজলে আরও মেলে। সাল ২০২৪। মণিপুরের টিপাইমুখ থেকে অসমের চাচরের উদ্দেশে চলেছিল এক কুমড়োবোঝাই ট্রাক। স্থানীয় পুলিশের কাছে খবর ছিল আগের থেকেই। তাই ট্রাকের পথ আটকে তল্লাশি শুরু হল। অল্প চেষ্টাতেই কুমড়োর একদিকের গা খুলে এল দরজার মতো! অবাক চোখে তল্লাশকারীরা দেখলেন, কুমড়োর ভিতরে প্লাস্টিকবন্দি সাবানের বাক্স! আর সে বাক্সের ভিতর ব্রাউন সুগার! মোট ৩০টা এমন সাবানের কৌটো মিলিয়ে, সাড়ে তিন কোটি টাকার মাদক পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত।
কুমড়োর ভিতরে প্লাস্টিকবন্দি ব্রাউন সুগার!
চলতি বছরেরই ৩১ জানুয়ারি। বিহারের ছাপওয়া-তুরকালিয়া রোড ধরে চলেছিলেন এক বাইক আরোহী। ভারত-নেপাল বর্ডারের কাছে যখন পুলিশ সে বাইক আটকে দাঁড়াল, তখন তাদের হাতে এল কেবল এক মুখ-বাঁধা চটের বস্তা। বস্তা খুলতেই যদিও মোট ৬৩ প্যাকেট চরস পাওয়া গেল!
তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়। তল্লাশি এগোতে বিস্ময়ে তাজ্জব আধিকারিকেরা। দেখা গেল, নিখুঁত কারিগরি কাজে লাগিয়ে বাইকের পেট্রলের ট্যাঙ্কের ভিতর তেলের জায়গা কমিয়ে তৈরি হয়েছে গোপন কুঠুরি। ইঞ্জিনের ক্ষেত্রেও তা-ই। আর সেইখানে লুকানো আরও ৩১ কিলোগ্রাম চরস। অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে যদি পাচারকারী পুলিশের কাছে ধরা পড়েও যায়, বাড়তি চরসটুকু বাঁচিয়ে ফেলা যাবে!
মালগাড়ির ভিতর কুঠুরি বানিয়ে লুকানো হয়েছে চরস!
তবে সবচাইতে বেশি অবাক করা ঘটনাটি বোধহয় বছরের একেবারে শুরুর দিকের। তেজাজি নগর পুলিশের হাতে আটক হল সুবিশাল মালগাড়ি। গাড়ির চালকের কথায় অসঙ্গতি পেল পুলিশ। আর তাই শুরু হল গাড়িটির চুলচেরা তল্লাশি। এরপরের ঘটনা সিনেমার মতো! দেখা গেল, গাড়ির ডিজেল ট্যাঙ্কের পাশে তৈরি করা হয়েছে একাধিক ছোট কুঠুরি। বাইরে থেকে দেখলে, যা ডিজেল ট্যাঙ্কের অংশ বলেই ভুল হয়। টুলবক্সের ভিতরেও রয়েছে এমন কুঠুরি।
আর প্রতিটি কুঠুরির ভিতরেই রাখা পোস্তফুলের খোসার গুঁড়ো! এই গুঁড়ো থেকেই তৈরি হয় আফিম। ট্রাকে পাওয়া মোট গুঁড়োর পরিমাণ প্রায় ৮৭ কেজি! ইন্দোরের পথ হয়ে, পঞ্জাবে পৌঁছতে হবে এই মাদকদ্রব্য, বদলে চালক পাবেন হাজার দশেক টাকা, চাপের মুখে চালকই তা জানাল পুলিশকে। পুলিশের বিশ্বাস, জনপ্রিয় সিনেমা ‘পুস্পা’ দেখেই যে এ ধরণের মাদক পাচারের অভিনব পদ্ধতির অবতারণা!
সিনেমা দেখে নায়কের মতো হয়ে ওঠার ইচ্ছে সাধারণ মানুষের বরাবরই প্রবল। কিন্তু নায়ক হিসেবে ঠিক কোন ধরনের চরিত্রদের বেছে নিচ্ছেন নির্মাতারা, এমন ঘটনা সে প্রশ্ন জাগায় বৈকি! দর্শকদের বাড়তি অ্যাড্রিনালিন রাশ-এর খাতিরে সামাজিক দায় কি পুরোপুরি এড়িয়ে চলা যায়? যদিও বাস্তব যে ক্ষেত্রবিশেষে সিনেমাকেও হার মানায়, পাচারের অভিনবত্বের জন্য সিনেমার মুখাপেক্ষী নয় বাস্তবের মাদক ব্যবসায়ীরা, সে কথাও বলা বাহুল্য।
