বাবা খেলেছেন জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে। পদকও জিতেছেন। এবার মেয়ে কিশে ডোলকার ভুটিয়ার পালা। তিনি অবশ্য ফুটবলার নন। সিকিমের চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু। এবার তাঁর পালা জাতীয় সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জয়ের। ছেলে উগেন ভুটিয়াও ফুটবল খেলছে। ভারতের বুকে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলগুলির হয়ে একটি ফুটবল দল যাচ্ছে চিন সফরে। সেই দলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার উগেন। খেলবে এবার জুনিয়র আই লিগেও। ছোট মেয়ে সামার জিমন্যাস্টিকস করে। কিন্তু সে ক্রীড়াবিদ হওয়ার দৌড়ে নামবে কি না, এখনও পরিস্কার নয়। তবে বড় মেয়ে কিশে ডোলকার যে ইতিমধ্যেই সাঁতারু হিসেবে সিকিমে সাড়া ফেলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
১৭ আগস্ট থেকে ওড়িশায় শুরু হওয়া জাতীয় সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে অনুর্ধ-১৬ বিভাগে ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইলে সিকিমের হয়ে জলে নামবে কিশে। মানে, ভারতের কিংবদন্তি ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়ার (Bhaichung Bhutia) বড় মেয়ে। আর তা নিয়ে অবশ্য বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই তারকা বাবার। বরং উদাসীনভাবে বললেন, "সিকিম থেকে মহিলা সুইমার হিসেবে যেহেতু একাই যাচ্ছে, তাই ওর সঙ্গে ওড়িশা যাব। বাকিটা কিশে কী করবে, তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই।"
দু'বছর আগে কিশে ডোলকার ভুটিয়ার যখন বয়স যখন মাত্র ১৪, তখন সে নেমেছিল সিকিমের সিনিয়রদের সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে। আর কী আশ্চর্য, সিনিয়রদের হারিয়ে সিকিমের সেরা মহিলা সাঁতারুর তকমা তখনই কিশে ডোলকারের গলায়। আর ওড়িশায় তো অনুর্ধ-১৬ জাতীয় সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ। ফলে সিকিম থেকে মহিলা বিভাগে পদক জয়ের লক্ষ্যে একাই প্রতিনিধিত্ব করবে কিশে। ফুটবল ছেড়ে মেয়ে হঠাৎ সাঁতারে? ১৩ আগস্ট ইস্টবেঙ্গল কর্তা প্রয়াত পল্টু দাসের জন্মদিনের অনুষ্ঠান উপলক্ষে কলকাতায় এসেছেন বাইচুং। কফিশপে বসে গল্প করার ফাঁকে হঠাৎই বলে বসেন মেয়ের কৃতিত্বের কথা। আর তারপরই বারবার করে অনুরোধ, "প্লিজ, আমি চাই না আমার সন্তানদের কথা জানাজানি হোক। তাতে বড় হওয়ার পথে আমার জন্যই চাপে পড়ে যাবে ওরা।" কিন্তু ফুটবল ছেড়ে সুইমিংয়ে কেন? "পরিবার থেকে আমরা কোনওদিনই কোনও সন্তানকে বলিনি খেলবে না অন্য কিছু করবে। দেখলাম, কিশের সুইমিংয়ে আগ্রহ। তাই মন দিয়ে সুইমিং করে। উগেনের আগ্রহ ফুটবলে। তাই ফুটবল খেলে। আর ছোট মেয়ে সামারার জিমনাস্টিকস করার ইচ্ছে। এরপর ভবিষ্যতে ওরা খেলাকে পেশা করবে, না কি অন্য কোনও পেশায় যাবে, সেটা ওরা ঠিক করবে। আমার কাজ শুধু উৎসাহিত করা।" কথা বলার মাঝেই ছেলে উগেনের স্কুল ফুটবলে গোল দেখাচ্ছিলেন বাইচুং। অনুর্ধ-১৬ ফুটবলার। কিন্তু এরমধ্যেই উচ্চতায় বাবাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। শক্ত-সমর্থ চেহারা। খেলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে। কেন এখনও কোনও ক্লাব ফুটবলে দিচ্ছেন না? বাইচুং বললেন, "আগে পড়াশোনা শেষ করুক। সবে তো ক্লাস টেন। ভেবেছিলাম, ছুটিতে ইস্টবেঙ্গলের জুনিয়র দলে প্র্যাকটিসে পাঠাব। কিন্তু গুরগাঁও থেকে আর নিয়ে আসা হল না।"
বাইচুং নিজে প্রায় প্রতিদিন ভারতের বিভিন্ন শহরে চক্কর দিযে বেড়ালেও, পরিবার বেশিরভাগ সময়ে থাকে গুরুগাঁওতে। সেখানেই পড়াশোনা, খেলাধুলো। সিকিমের বাড়িতে চলে আসে গরম কালে। নিজেই বলছিলেন, "চাইছিলাম না, মেয়ের সঙ্গে ওড়িশায় জাতীয় সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে যেতে। ভীষণভাবেই চাইছিলাম সিকিমের দলের সঙ্গে ট্রাভেল করুক। কিন্তু মহিলা বিভাগে ও একা তাই আমাকে নিয়ে যেতে হচ্ছে। একাই যেহেতু কম্পিটিশনে নামছে, ওদের চ্যাম্পিয়নশিপে আমি উপস্থিত থাকলে ওরা চাপে পড়ে যেতে পারে। তাই চেষ্টা করি ওদের খেলার জায়গায় না যেতে। কারণ, বড় হওয়ার দৌড়ে প্রতিটি মুহূর্তে ওদের আমার ছায়ার সঙ্গে তুলনা টানা হবে। বেড়ে ওঠার সময় এই চাপ কতটা পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে আমার থেকে ভাল আর কে জানে?"
কথা শেষ করেই ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করলেন, গুরগাঁও থেকে ভুবনেশ্বরের বিমানের টিকিট বুক করার জন্য। তখন আর তারকা বাইচুং ভুটিয়া নয়। এক যত্নবান পিতা, যিনি সন্তানের চিন্তায় সব সময় সতর্ক।
