বাস্তবকে মেনে নিতেই হবে। বর্তমানে দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশের জন্য অবসর আর চিন্তামুক্ত, আরামদায়ক যাপন নয়। বরং উদ্বেগের বিষয়। তবে কিছু 'ভুল' এড়ালে এই ছবি বদলানোও সম্ভব। তাহলে কী, কী করবেন আর কী, কী অতি অবশ্যই এড়িয়ে যাবেন, জানালেন শুভ্র নন্দী, শেল্টার মানির সিইও
ভারতের অধিকাংশ মানুষ অবসরের পর অখণ্ড স্বাধীনতার বদলে মানসিক চাপে ভোগেন। কথাটা কড়া শোনাল বটে, তবে এটাই বাস্তব। আর ব্যাপারটা যে অজানা, তাও নয়। আমি এক পা এগিয়ে এ-ও বলতে চাই যে, এই দেড়শো কোটির দেশ নিঃশব্দে এক অবসরকালীন আর্থিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মধ্যবিত্ত বিশ্বাস করে এসেছেন যে অবসর মানে শান্তি আর স্থিতি। কিন্তু রিয়েলিটি দেখুন, সেখানে অন্য ছবি। বর্তমানে বহু ইন্ডিয়ানের জন্য অবসরকাল আর আরামদায়ক নয়, বরং উদ্বেগে ভরা।
কয়েকটি স্ট্যাটিসটিক্স দিই, এগুলিই বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে আপনার চোখের সামনে। গত কয়েক দশকে ভারতে গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; বর্তমানে তা প্রায় ৭০-৭২ বছরে পৌঁছেছে। শহুরে অনেক পরিবারে ৮০ বা ৮৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকা এখন সাধারণ ঘটনা। অর্থাৎ, কেউ যদি ৬০ বছরে অবসর নেন, তবে তঁার আরও প্রায় ২৫ বছর ধরে উপার্জনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য কী জানেন? অবসর পরিকল্পনার গুরুত্ব সেই হারে বাড়েনি!
ভারতের অধিকাংশ বেসরকারি কর্মচারীর নির্দিষ্ট পেনশন নেই। এদিকে ক্রমবর্ধমান ইনফ্লেশন (বাড়তে থাকা মেডিকাল খরচ নিয়ে আলাদা ভাবে বলব) এবং বদলে-যাওয়া পারিবারিক কাঠামো অবসর পরিকল্পনাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবুও বহু মানুষ এখনও আর্থিকভাবে রিটায়ারমেন্টের জন্য প্রস্তুত নন।
আসল সমস্যাটি কী?
বাস্তব পরিস্থিতি একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। দু'টি পয়েন্ট তুলে ধরি। আজ যে পরিবার মাসে ৭০,০০০ টাকা খরচ করে, ২০ বছর পরে (যদি গড় মূল্যবৃদ্ধি ৬% থাকে), তবে সেই খরচ প্রায় ২ লক্ষে পৌঁছতে পারে। স্বাস্থ্যখরচের বৃদ্ধি আরও বিপজ্জনক। আমাদের দেশে চিকিৎসা-জনিত ব্যয় বছরে প্রায় ১০% থেকে ১২% হারে বাড়ছে।
তার মানে খুব সোজা। অবসর পরিকল্পনা এখন শুধুমাত্র পুরোনো জমানার সঞ্চয়ের বিষয় নয়। রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান আসলে দু-এক দশক ধরে ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়।
আমার অভিজ্ঞতার নির্যাসটি আপনার সঙ্গে শেয়ার করি, শুনুন। দেখতে পাই যে অনেক মানুষ তাঁদের রিটায়ারমেন্টের অধিকাংশ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখেন। মানছি এফডি স্থিতিশীলতা দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কর কাটার পর এর রিটার্ন অনেক সময় মূল্যবৃদ্ধিকে হারাতে পারে না। ফলে অবসরপ্রাপ্তদের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এক অদৃশ্য আর্থিক চাপ তৈরি হয় তাঁদের উপর।
যে ভুল করবেন না
দেখুন, অনেক ধরনের ইনভেস্টরের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করি। বেশ বুঝি যে, তঁাদের একাংশ দেরিতে ইনভেস্ট করা শুরু করেছেন। এই ভুল করবেন না। বিষয়টি একটু ঘুরিয়ে বলি, সহজে বোঝা যাবে। দু’টি ইনভেস্টরের উদাহরণ দিই।
প্রথম জন পঁচিশ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকার এসআইপি করেন এবং বছরে ১২% হারে বৃদ্ধি পান। তাহলে ৬০ বছর বয়সে তঁার সম্ভাব্য সম্পদ প্রায় ৩.৫ কোটি টাকা হতে পারে, সব শর্ত পূরণ হলে।
দ্বিতীয় ইনভেস্টর দেরি করেছেন, চল্লিশ বছর বয়সে শুরু করেছেন। তাঁর ক্ষেত্রে সম্পদের পরিমাণ ৬০ লক্ষেরও নিচে থাকতে পারে। কি বিশাল তফাত, তাই না?
আমার মতে আসল পার্থক্যটি কিন্ত বিনিয়োগের অঙ্কে নয়, বরং সময় এবং কম্পাউন্ডিং, এই দুই শক্তির খেলায় তৈরি হয়। আর ঠিক এই কারণেই অনেক মানুষ ভাল উপার্জন করেও অবসরের পর আর্থিক চাপে পড়েন।
তাহলে কী করা উচিত?
অবসর পরিকল্পনা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করুন। আদর্শভাবে প্রথম বেতন থেকেই অবসর পরিকল্পনা চালু করা উচিত। অল্প এসআইপি হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ভাল ভাবে সম্পদ তৈরি করতে পারে, কারণ কম্পাউন্ডিং করতে গেলে সময় দিতে হবে।
আয় বাড়ার সঙ্গে বিনিয়োগও বাড়ান। অনেকেই দেখি যে প্রতি বছর জীবনযাত্রার খরচ বাড়ান, কিন্তু বিনিয়োগ বাড়ান না। এমন কেন হবে? একটি সহজ নিয়ম বলে রাখি, প্র্যাকটিস করবেন: যখনই বেতন বাড়বে, এসআইপি পরিমাণ ১০% থেকে ১৫% বাড়ান। এই ছোট অভ্যাসটি ২০-৩০ বছরে অবসরের চিত্র বদলে দিতে পারে।
শুধুমাত্র সম্পদ নিয়ে নয়, নিয়মিত ক্যাশ ফ্লো নিয়ে ভাবুন। এর ভিত্তিতে পরিকল্পনা করুন। অবসর জীবনের সফলতা শুধু কত টাকা জমেছে তার উপর নির্ভর করে না। বরং মাসিক আয় আপনার জীবনযাত্রার খরচ ঠিকঠাক সামলাতে পারছে কি না, সেটিই আসল।
শেষ করার আগে দু'তিনটি ফর্মূলা জানিয়ে রাখি
- স্থিতিশীল আয় যদি থাকে, সেভিংস করার চেষ্টার কোনও খুঁত রাখবেন না।
- মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধি হলে তো কথাই নেই, সে সুযোগ সবার আসে না, পুরোদস্তুর ব্যবহার করুন।
- জরুরি প্রয়োজনে লিকুইডিটি ঠিক রাখুন, অন্তত কয়েক মাসের ‘বাফার’ থাকা উচিত।
- স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে নতুন আর কি বলব! ফর দ্য রেকর্ড, এই বিষয়টি অবহেলা করবেন না। আপনার ভাল একটি মেডিক্যাল কভার দরকার হবে, মনে রাখবেন।
দীর্ঘমেয়াদে ইকু্যইটি নিয়ে চিন্তা করুন। অনেকে বাজারের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামার ভয়ে ইকু্যইটি এড়িয়ে চলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবৃদ্ধিকে হারানোর ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট ভূমিকা আছে। তবে মূল বিষয় হল সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন, জেনে রাখুন।
শেষ করছি, কিছু মনের কথা বলে। বাজারের বিষয়ে দুমদাম ভবিষ্যদ্বাণীর করার থেকে টিকে থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চলবেন। মনে রাখবেন, অবসরের পর স্বাধীনতা হঠাৎ একদিনে, ৫৫ বা ৬০ বছর বয়সে, আসে না।
