দীর্ঘমেয়াদে সফল বিনিয়োগের রহস্য অনেক সময়ই কিছু সরল অভ্যাসের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে। সেগুলি খুঁজে বের করা পেশাদার বিশেষজ্ঞদের কাজ। 'সঞ্চয়'-এর পাঠকদের জন্য সেই পাঁচ অভ্যাসের মূলমন্ত্র জানিয়ে দিলেন মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের সৌরভ মুখার্জি
‘সঞ্চয়’ পাঁচ বছরে পড়ল, জন্মদিনের সকালে আপনাদের পাঠক তথা ইনভেস্টরদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। বছরের এই সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ফিনান্সিয়াল ইয়ারের শেষ কোয়ার্টারে আছি আমরা। কিছু ভাল অভ্যাস গড়ে তোলার সন্ধিক্ষণে আছি আমরা, কয়েকটি জোরদার চিন্তাভাবনা শুরু করা যাক আজ থেকেই। সেই সুবাদেই আমার কলম ধরা।
গোড়াতে একটি ছোট্ট কথা বলতে চাই। বিনিয়োগের দুনিয়ায় আমরা প্রায়ই জটিল বিষয় নিয়ে ভাবি–কোন স্টক নেব, কখন কিনব অথবা কখন বিক্রি করব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সফল বিনিয়োগের রহস্য আসলে অনেক ক্ষেত্রে কয়েকটি সরল অভ্যাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে থেকে আমি আজ পাঠকদের জন্য পাঁচটি পয়েন্ট বেছে নিয়েছি। একটু গুছিয়ে বলি একে একে।
প্রথম কথা, বিশেষ কিছু স্টক খুঁজে পাওয়ার জন্য নিজের অমূল্য সময় ব্যয় করবেন না। অনেক বিনিয়োগকারী, আমি দেখেছি, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চার্ট দেখেন, খবর ট্র্যাক করেন, টেলিগ্রাম গ্রুপে আলোচনা করেন। আবার একই সঙ্গে অন্য কাজকর্মও করেন। কিন্তু বাস্তবটা হল এটি এক ‘ফুল-টাইম’ পেশা। পেশাদার পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের কাজই হল এই সব বিশ্লেষণ করা। ইনভেস্টর যদি নিজের সময় ব্যবহার করেন সঠিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে, তাহলে তাঁর সুবিধা বেশি। কীভাবে নিয়মিত বিনিয়োগ চালিয়ে যাবেন, তা নিয়েও তাঁকে চিন্তা করতে হবে।
দ্বিতীয় অভ্যাস, এটি নতুন কিছু নয়, কিন্ত বারবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করুন এবং নিয়ম মেনে ইনভেস্টমেন্ট করুন। বাজারের ওঠানামা আমি বা আপনি কন্ট্রোল করি/করেন না, তাই এই নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না। প্রতি মাসে বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া অনেক বেশি কার্যকর। আর অন্তত বছরে একবার নিজের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করুন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনার বিনিয়োগের দিশা ঠিক করতে সাহায্য করবে।
তৃতীয় পয়েন্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব ধরনের ইনভেস্টরদের জন্য কার্যকর। তা হল পরিষ্কার লক্ষ্য নির্ধারণ। এটি শুরু করার আগে করে নেবেন। আপনার আর আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ চাহিদা কী? সন্তানের শিক্ষা, বাড়ি কেনা, অবসর জীবন–এই সব লক্ষ্যকে ছোট, মাঝারি ও দীর্ঘ মেয়াদে ভাগ করুন।
প্রতিটা লক্ষ্য পূরণের জন্য আলাদা বিনিয়োগ কৌশল দরকার হতে পারে। সব ‘গোলস’ একই ঝুড়িতে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বুঝতেই পারছেন। চতুর্থ অভ্যাসটি নিয়ে এবার বলি। দেখুন, শুধু দেশের মার্কেটের মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখবেন না, ভারতের বাইরেও তাকান। আমরা অনেকেই নিজের দেশের বাজারকে প্রথম পছন্দের ভেতর রাখি, সেটি হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বের অর্থনীতিতে নানা রকম সুযোগ আছে, সেগুলো হাত ফসকে যেন বেরিয়ে না যায়। প্রযুক্তি বা কনজাম্পশন-নির্ভর ব্যবসার কথা বলা চলে। এই সমস্ত সেক্টরে অনেক ধরনের সুবিধার উৎস ভারত নয়, অন্য দেশ। তাই সাধারণ বা মধ্যবিত্ত ইনভেস্টরেরও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বা geographical diversification দরকার হবে। এতে আপনার পোর্টফোলিও আরও শক্তিশালী হবে বলে আমি মনে করি।
এবার বলি, উপার্জন করলে আয়করের হাত থেকে বাঁচা মুশকিল, যদিও সম্প্রতি কর ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হয়েছে। তবুও সব ইনভেস্টরদের উদ্দেশ্যে বলি, চালু ইনকাম ট্যাক্সের নিয়ম জেনে রাখা উচিত। এই সংক্রান্ত খবরাখবরের দিকে নজর রাখুন। অনেক সময় দেখি বিনিয়োগকারীরা রিটার্ন বা তাৎক্ষণিক কিছু নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে কর পরিকল্পনাকে তেমন গুরুত্ব দিতে পারেন না। অথচ ‘ট্যাক্স অপ্টিমাইজেশন’ খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর জন্য আপনার প্রকৃত রিটার্ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগ করার পাশাপাশি এখনকার আয়করের নিয়মকানুনও বুঝে নেওয়া জরুরি।
পরিশেষে...ঘটনাবহুল বাজারের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আমরা সকলেই। কেউ নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবে না সারা বছর ধরে জল কোন দিকে গড়াবে। যে পাঁচটা ভাল অভ্যাস বললাম, যেগুলো মেনে চললে তাহলে বিনিয়োগের পথ অন্তত কিছুটা সহজ হয়ে যাবে। আমার বারে বারেই মনে হয় যে, সফল বিনিয়োগ সব সময় জটিল সিদ্ধান্ত নয়। ধারাবাহিকভাবে ভাল অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে কাজটা সরল হয়ে যেতে পারে।
