Advertisement
সাড়ে ৪ মাস ধরে ডিম আগলে রাখে, মৃত্যু হয় সন্তান জন্মের পরই! অবাক করে মা অক্টোপাসের আত্মত্যাগ
ঠিক যেন চোখে জল আনা সিনেমার গল্প! প্রকৃতির বিধানেই মা অক্টোপাস ডিম রক্ষা করতে তার প্রাণ বলিদান দেয় ঠিকই। তবে সুস্থ শরীরের একটি প্রাণীকে এভাবে তিলে তিলে মরে যেতে দেখলে, তামাম পশুপ্রেমীদের কষ্ট হয় বৈকি!
‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’— প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই সন্তানকে নিজের প্রাণ দিয়ে রক্ষা করে মা। কেবল মানুষের পৃথিবী নয়, প্রাণীজগতের ছবিও একই। মা হাতি দীর্ঘ ২২ মাসের গর্ভাবস্থা পার করে। হলুদ ঠোঁটের হর্নবিল ডিম-সহ নিজেকেও গাছের কোটরে আটকে রাখা টানা দুই মাস। তবে প্রাণী জগতের সবচাইতে শক্তিশালী মা প্রাণীটি নিঃসন্দেহে অক্টোপাস। সন্তানের মুখ চেয়ে নির্দ্বিধায় শহীদ হয় মা অক্টোপাসেরা।
অক্টোপাসের নানা প্রজাতি দেখতে মেলে সমুদ্রের গভীরে। তাদের কয়েকটি প্রজাতি আবার মানুষ অথবা অন্য প্রাণীরা খাদ্য হিসেবেও গ্রহণ করে থাকে। তবে এরই মধ্যে থাকে অক্টোপাসের এমন কয়েকটি প্রজাতিও, যারা বিষধর। যাদের সংস্পর্শে এলে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে! এক দেখায় মনে না-হলেও, অক্টোপাস প্রবল বুদ্ধিধর ও বিচক্ষণ। যে কারণে ঘটনাবিশেষে ভাগ্য গণনার কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে তাদের।
গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী এক বিশেষ প্রজাতির অক্টোপাসের নাম গ্রেনলেডোন বোরেওপ্যাসিফিকা। জীবৎকাল আনুমানিক ৫ বছর। যদিও এই জীবনের বেশিরভাগটাই তারা কাটিয়ে দেয় ডিম রক্ষা করার কাজে! পরিণত বয়সে আসার পর, সমগ্র জীবনে মাত্র একটিবারই ডিম পাড়ে এই অক্টোপাস। ডিমে তা দিয়ে সন্তানদের সফলভাবে ভূমিষ্ঠ করাই যেন এ প্রাণীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
সমুদ্রে এমন বহু শিকারি প্রাণী রয়েছে, যারা অক্টোপাসের ডিম খেতে পছন্দ করে। মা অক্টোপাস সামান্যতম বেখেয়াল হলেই, ডিম চুরি করে নিয়ে যায় তারা। তাই ডিম পাড়ার পর অত্যন্ত সাবধানী হয়ে ওঠে মা অক্টোপাস। শত্রুর আক্রমণের সম্ভাবনা সারাক্ষণ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
গ্রেনলেডোন বোরেওপ্যাসিফিকা এক-একবারে ১৬০টি ডিমের জন্ম দেয়, যা একসঙ্গে দেখতে আঙুরের ঝাঁকের মতো। এক-একটি ডিমের আকার বড়জোর একটা জলপাইয়ের মতো। মা অক্টোপাস শরীর দিয়ে আগলে রাখে ডিমের ঝাঁক। ডিমের ভিতরে বেড়ে ওঠে তার অপত্য, এ সময়ে প্রভূত পরিমাণে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। তাই মা অক্টোপাস ক্রমাগত লবণাক্ত সমুদ্রের জল ছিটিয়ে চলে ডিমের গায়ে। ডিমে ফাটল ধরছে কি-না, তা খেয়াল রাখে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান পাহারা দেওয়ার কাজ শেষ হলে মারা যায় মা অক্টোপাস। এর কারণ মূলত দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকা। সমগ্র ‘ব্রুডিং পিরিয়ড’ (ডিম পাহারা দেওয়ার সময়) জুড়ে না খেয়ে থাকতে হয় তাকে। অন্য অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে, পুরুষ সঙ্গীটি খাবারের যোগান দেয় এই সময়ে। বিশেষত পাখিদের ক্ষেত্রে এ জিনিস প্রায়শই দেখতে মেলে। কিন্তু মা অক্টোপাসটিকে একাই লড়তে হয় জীবনের লড়াই!
কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে ‘ব্রুডিং পিরিয়ড’ চলে মাসকয়েক। তবে গ্রেনলেডোন বোরেওপ্যাসিফিকার ক্ষেত্রে তা বছর পেরিয়ে যায়! সম্প্রতি ‘মন্টেরে বে অ্যাকোরিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ সম্পাদিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই প্রজাতির একটি মা অক্টোপাস দীর্ঘ ৫৩ মাস ধরে রক্ষা করে গিয়েছে ডিমগুলি! অর্থাৎ যা কিনা সাড়ে চার বছরের সমান! পৃথিবীর সমস্ত ধরনের প্রাণীর সাপেক্ষেই এটি দীর্ঘতম ব্রুডিং পিরিয়ড— জানিয়েছেন তাঁরা।
এই সাড়ে চার বছরে একটিবারের জন্যও খাবারের সন্ধান করেনি মা অক্টোপাসটি, জানিয়েছেন বিজ্ঞানীমহল। যে বিশেষ অক্টোপাসটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছিলেন তাঁরা, সেটি ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরে ক্যানিয়নের গভীর জলের নিচে এক পাথরের তলায় ডিম-সহ ঠাঁই নিয়েছিল। প্রায় ১,৪০০ মিটার গভীরে ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা মাত্র ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ বরফের মতো ঠান্ডা সেই জল! সচরাচর নিম্ন তাপমাত্রায় ডিম ফুটতে বেশি সময় লাগে।
সাধারণত সমুদ্রগর্ভের ১৪০০-১৬০০ মিটার গভীরেই বাস করে এই প্রজাতির অক্টোপাসেরা। কোনওকালেই সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। এই অক্টোপাস আকারে অপেক্কাকৃত ছোট, তবে এর গড়ন আঁটোসাটো। বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রেনলেডোন বোরেওপ্যাসিফিকা প্রজাতির ছানা অক্টোপাসেরা জন্মের সময়েই অন্যান্য প্রজাতির চাইতে অনেকখানি বড় হয় আকারে। ফলে জলজীবনে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও অন্যান্যদের চাইতে এদের বেশি।
নজরবন্দি মা অক্টোপাসটির ওপর গবেষণা চালাতে মূলত রোবটের ব্যবহার করেন বিজ্ঞানীরা! ‘রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল’ বা ROVs-এর সাহায্যেই নজর রাখেন ‘মন্টেরে বে অ্যাকোরিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ কর্তৃপক্ষ। কারণ মানুষের হস্তক্ষেপ সাধারণত পছন্দ করে না প্রাণীজগত। তাছাড়া এমন সংবেদনশীল অবস্থায় নিরাপত্তার অভাব বোধ করুক প্রাণীটি, বিজ্ঞানীমহল কখনোই তা চাননি।
তবে গবেষণার খাতিরে অক্টোপাসটির গতিবিধি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই উক্ত ৫৩ মাস সময়কালে বিজ্ঞানীরা তাকে দেখতে যান ১৮ বারেরও বেশি। ডিম ছেড়ে খাবারের সন্ধানে যাচ্ছিল না মা প্রাণীটি। তার অবস্থা বুঝে বহুবার কাঁকড়ার টুকরো সাধেন বিজ্ঞানীরা। কতক্ষণ তার এই মনোবল থাকে, তাও ছিল বিজ্ঞানীর বিচার্য। কিন্তু কোনওরকম প্রলোভনেই ডিম ছেড়ে তিলমাত্র নড়তে নারাজ মা অক্টোপাস।
Published By: Utsa TarafdarPosted: 07:07 PM Mar 07, 2026Updated: 07:07 PM Mar 07, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
