Advertisement
যুদ্ধ, জঙ্গি হানা, পিচ খোঁড়া! বারবার ভারত-পাক ক্রিকেটে বাধা হিংসা, এবার মহারণে পুরোপুরি ইতি?
বাজপেয়ী, মনমোহনদের ক্রিকেট কূটনীতি কি ব্যর্থ হচ্ছে মোদি জমানার উগ্র জাতীয়তাবাদে?
ভারত ও পাকিস্তান। জন্মলগ্ন থেকেই একে ওপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। কখনও ঘোষিত, কখনও অঘোষিতভাবে। আর সেই যুদ্ধ পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে সেই জিনিসটাকে যা কিনা দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করতে পারত। ক্রিকেট। ইতিহাস সাক্ষী, ভারত-পাকিস্তান কূটনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বারবার প্রভাবিত হয়েছে ক্রিকেট। সেটা সেই ১৯৬৫ সাল থেকেই।
ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক শুরু ১৯৫২-৫৩ সালে। সেই প্রথম পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলে দুই দেশ। খেলাগুলি দুদেশে মিলিয়েই হয়। এরপর ১৯৫৫ এবং ১৯৬০-৬১ সালেও একই রকম সিরিজের আয়োজন হয়। এই তিন সিরিজেই কোনও মীমাংসা হয়নি। খেলা হয়েছিল বন্ধুত্বপূর্ণ আবহে। সিরিজ দুটিও শেষ হয় অমীমাংসীতভাবে।
এরপরই ক্রিকেট মাঠে যুদ্ধের করাল গ্রাস। ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জোড়া যুদ্ধ। যার জেরে দেড় দশকের বেশি সময় দুদেশের মধ্যে কোনওরকম দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়নি। ১৯৭৮ সালে দু'দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য দুই তরফ থেকেই ক্রিকেটকে হাতিয়ার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবারও শুরু হয় ক্রিকেট।
আটের দশক থেকে ভারত ও পাকিস্তান নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলা শুরু করে। শারজা, টরেন্টোর মতো সিরিজে বিভিন্ন ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের মাধ্যমে নতুন করে গতি পায় ক্রিকেট মাঠে দু'দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ধীরে ধীরে শুরু হয় দ্বিপাক্ষিক সিরিজও। এই সময় বহু স্মরণীয় ক্রিকেটীয় মুহূর্তের সাক্ষী থেকেছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।
কিন্তু বাধা এরপরও এসেছে। ১৯৯৯ কার্গিল যুদ্ধ এবং ২০০৮ সালের মুম্বই হামলা ফের প্রশ্নের মুখে তুলে দিয়েছে দুদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক। ১৯৯৯ কার্গিল যুদ্ধের পর ফের দু'দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যায়। মজার কথা হল, সেবছরই পাকিস্তানের ভারত সফর ছিল। সেই সফরে বাধা দেওয়ার কম চেষ্টা হয়নি। এমনকী দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে শিব সেনার কিছু অনুগামী ঢুকে পিচ খুঁড়ে দিয়েছিল। যা নিয়ে আজও গর্ববোধ করেন বাল ঠাকরের অনুগামীরা।
কার্গিল যুদ্ধের বছর পাঁচেক বাদে অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং পারভেজ মুশারফের উদ্যোগে ফের দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে। ২০০১ সালে সংসদে হামলার পর যা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে বাজপেয়ী সেটাও করেন। ২০০৩-০৪ সালে পাকিস্তান সফরে যায় ভারতীয় দল। প্রায় ১৪ বছর পর ভারতীয় দল পাকিস্তানে পা রাখে। সেই সিরিজ ঐতিহাসিকভাবে সফল। ওই সিরিজের পর দুই দেশের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মনমোহন সিং আসার পরও বাজপেয়ীর মতোই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেন। পণ্ডিত নেহেরুর মতো তিনিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক না রাখলে দেশের আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যতিক্রম নয় পাকিস্তানও। ওয়াঘা সীমান্তের অপর প্রান্ত থেকে হিংসা, সন্ত্রাসের চেষ্টা যখন সমানে চলছে তখনও তিনি ভারত-পাক সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন। আর সেই কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করে গিয়েছেন ক্রিকেটকে।
মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০০৫-০৬ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজ খেলে ভারতীয় দল। সেবার পারভেজ মুশারফও দিল্লিতে আসেন। তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন একসঙ্গে ক্রিকেট দেখেন। অবশ্য ভারত-পাক সম্পর্কে তখনও তলানিতে ঠেকেনি।
ফের সমস্যা শুরু হয় ২০০৮ মুম্বই হামলার পর। মুম্বইয়ের তাজ হোটেলে পাক সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় ১৭৫ জনের মৃত্যুর পর তলানিতে ঠেকে দুদেশের সম্পর্ক। গোটা দেশ তখন ক্ষোভে ফুঁসছে। ফের বন্ধ হয় ক্রিকেট। ২০১১ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেমিফাইনালকে ফের কূটনীতির মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেন মনমোহন। মোহালিতে সেমিফাইনালে ভারত-পাক মহারণ দেখতে প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ জানান পাক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে। মোহালিতে পাশাপাশি বসে সেই সেমিফাইনাল দেখেন গিলানি এবং মনমোহন। যা দুই দেশেই ঐক্যের বার্তা দেয়। পরে পাক দলের সঙ্গে আলাদা করে কথাও বলেন মনমোহন। ২০১২-১৩ সালে একবার দ্বিপাক্ষিক সিরিজও হয়েছিল। সেটাই দু'দেশের মধ্যে শেষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। দুই দেশ আর কোনও দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেনি।
পরে নরেন্দ্র মোদির সরকার অবশ্য পাকিস্তানের প্রতি মনমোহনের এই ‘নরমপন্থী’ মনোভাব পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। মোদি সরকারের সাফ বার্তা, সন্ত্রাস আর খেলাধুলো একসঙ্গে চলতে পারে না। এরপর ২০১৯ পুলওয়ামা হামলা, ২০২৫ পহেলগাম হামলা পরিস্থিতি আরও বিগড়ে দেয়। ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতেও ভারত পাকিস্তানে যায়নি। ওই টুর্নামেন্ট হয় হাইব্রিড মডেলে। ঠিক হয়, এবারে ভারতের মাটিতে যে বিশ্বকাপ হওয়ার কথা তাতেও পাকিস্তান খেলতে আসবে না। তাই পাকিস্তানের ম্যাচগুলি ফেলা হয় শ্রীলঙ্কাতে। এরপর এশিয়া কাপে করমর্দন বিতর্কও শিরোনামে ছিল।
Published By: Subhajit MandalPosted: 07:09 PM Feb 02, 2026Updated: 07:55 PM Feb 02, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
