যুগ বদলানোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্কের সমীকরণ। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দূরত্বে দাঁড়িয়ে বাবা-মাকে দেখত সন্তানেরা। তাঁদের জীবনে কী ঘটছে, তা জানার সুযোগ মিলত না। ফলে নিজের মতো করেই বুঝে নিত যতটুকু পারা যায়। কিন্তু বর্তমানে এই দূরত্ব ঘুচেছে। অনেক অভিভাবকই বন্ধুর মতো মেশেন সন্তানের সঙ্গে। সন্তানের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ হয়ে ওঠাটাই যেন হাল-আমলের নয়া পেরেন্টিং ট্রেন্ড।
কিন্তু মনোবিদরা বলছেন, সেক্ষেত্রেও সাধারণ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। কোন ধরনের কথা সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আগে সতর্ক হবেন বাবা-মা? জেনে নেওয়া যাক।
পারিবারিক সিক্রেট অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সঙ্গে আলোচনা না করাই শ্রেয়
১। রোজকার জীবনের ক্লান্তিতে প্রায়শই বড়রা বলে থাকেন ‘আর পেরে উঠছি না’, অথবা ‘এমনভাবে বাঁচার অর্থ হয় না’। এমন কথা যদি তাঁরা খেলার ছলেও বলে থাকেন, অনেক সময়েই মানসিক চাপের কারণ হয়ে যায় শিশুর ক্ষেত্রে। প্রাপ্তবয়স্কদের অনুভূতির সম্যক ধারণা তার নেই, ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সে।
২। আর্থিক কষ্ট সন্তানের সঙ্গে আলোচনা না করাই ভালো। পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ভালো নয় জানলে সামাজিক প্রেক্ষিতে তার মনে ভয় জন্মাতে পারে। বাকিদের তুলনায় নিজেকে হীন ভাবতে পারে সে। অর্থ উপার্জনের জন্য অন্যায় পথও বেছে নিতে পারে।
৩। বাবা-মায়ের সম্পর্কে যদি চিড় দেখা দেয়, তবে তা কখনওই সরাসরি সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত নয়। প্রয়োজনে ততটাই বলা যায়, যতটা তার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব। নয়তো অবুঝ মনের কিশোর বা কিশোরীটি নিজেই হয়ে উঠবে মানসিক রোগের শিকার।
৪। প্রতিটি পরিবারই নানা সময় বিবিধ টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যায়। পারিবারিক সিক্রেট অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সঙ্গে আলোচনা না করাই শ্রেয়। বড়রা হয়তো সে ঘটনার প্রতিঘাত কাটিয়ে উঠেছেন, কিন্তু শিশুর মনে তা গভীর ক্ষতের জন্ম দিতে পারে।
৫। বড়দের মধ্যে কে ভালো, কে খারাপ, তা আগে থেকেই চাপিয়ে দেবেন না সন্তানের উপর। বরং মানুষগুলির বৈশিষ্ট্য দেখে তার কাকে ভালো অথবা খারাপ লাগছে, তা বুঝে নেওয়ার সুযোগ দিন। হতেই পারে যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষটি আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে, আপনার শিশুর সঙ্গে সে তা করছে না।
সন্তানকে প্রয়োজনে ততটাই বলা যায়, যতটা তার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব
৬। হয়তো সন্তানের জন্মে পুরোপুরি সায় ছিল না বাবা অথবা মায়ের। কিংবা সন্তানপালনের ক্ষেত্রে অভিভাবক নানা সময় ব্যর্থ মনে করেছেন নিজেকে। সন্তানের সঙ্গে এমন তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধান হতে হবে। অবুঝ মনে সে যদি নিজেকে অযাচিত, অবহেলিত বলে মনে করে, তবে বেছে নিতে পারে আত্মহননের পথও, জানাচ্ছেন মনোবিদেরা!
শিশুর মানসিক গঠন বড়দের চাইতে অপরিণত। বাবা-মায়ের মন বোঝার বদলে যে যেন তাঁদের ঘৃণা করতে না শুরু করে, সে দায়িত্ব অভিভাবকেরই। বাবা-মা ঈশ্বর নন, বরং রক্তমাংসের মানুষ— সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এ শিক্ষা যেন সবার আগে গুরুত্ব পায়।
